দেশের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানি পদ্মা অয়েলের শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হককে এই অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এর আগেও সিরাজুল হক পদ্মা অয়েলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৩ কর্মকর্তার দুনীতি বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। অভিযোগ পদ্মা অয়েলের বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে একের পর এক অনুসন্ধান, মামলা ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।

উল্টো তাদের নানাভাবে পদোন্নতি ও পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানজুড়ে দুর্নীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি এই দুর্নীতির কারণে কোম্পানিটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক সহকারী পরিচালক বলেন, কতিপয় অসাদু কর্মকর্তার লাগামহীন দুর্নীতির কারণে আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে কোম্পানি। এদের কারও বিরুদ্ধে মামলা করলেও অধরা রয়ে গেছেন তারা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী করা হয়েছে এমন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও বহাল তবিয়তে আছে কোম্পানিতে। কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগও আনা হয়েছিল, কিন্তু ফলাফল শূন্য।

পদ্মা অয়েলের মোংলা বন্দরের এক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মোসাদ্দেক হোসেন কোম্পানির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার থাকা অবস্থায় ৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সময়ে এই অনিয়মটি সংঘটিত হয়।

এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মাহমুদ উল ইসলাম এবং সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেন। এতে বলা হয়, মোসাদ্দেক হোসেন কোম্পানির ৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ক্ষতির জন্য দায়ী। অথচ তিনি পদোন্নতির জন্য সম্প্রতি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন।

তবে সেসময় তার আবেদন নাকচ হয়ে যায়। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, এই আবেদন সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা পরিপন্থী। দুদক সূত্রে জানা গেছে, এরপরও কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে একটি সিন্ডিকেট তাকে পদোন্নতি দিয়ে কোম্পানির খুলনা জোনের প্রকল্প পরিচালক করে।

সম্প্রতি একই ব্যক্তিকে আবার মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন, পরিচালক আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও সদস্য করা হয়েছে আবু সালেহ ইকবালকে।

গত বছর ৯ জানুয়ারি কোম্পানি সচিব কর্তৃক পাঠানো এক অফিস আদেশে এই কমিটি ঘোষণা করার পর পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এরপর গত ১৫ অক্টোবর তাকে আবার কোম্পানির পরীবাগ প্রকল্পের পিডি নিয়োগ দেয়া হয়।

শুধু মোসাদ্দেক হোসেন নয়, গত ৬ মাসে দুদকের তালিকাভুক্ত কমপক্ষে ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি ও প্রাইজ পোস্টিং দেয়ার অভিযোগ আছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শাস্তির বদলে পুরস্কার দেয়ায় কোম্পানির অভ্যন্তরে ক্ষোভ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নও হুমকির মুখে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য নয়। একটি চক্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব অভিযোগ দায়ের করেছে।

এর আগে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েল হাইড্রেন্ট লাইন নির্মাণে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়। এতে আসামি করা হয় কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল খায়ের, বিমানবন্দর সার্ভিস স্টেশনের প্রকল্প পরিচালক আলী হোসেন ও ম্যাক্সওয়েলের ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের এমডি ফাহিম জামান পাঠানকে।

এছাড়া খুলনা দৌলতপুরে ৩ তলা অফিস ভবন নির্মাণে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অপর একটি মামলা দায়ের করে দুদক। এতে আসামি করা হয় প্রকল্প পরিচালক নুরুল আমিন, কর্মকর্তা আবদুর রহিম, সালেহিন আহমেদ আক্কাস ও ইউনুস অ্যান্ড কোম্পানির মালিক আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে। কিন্তু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় সবাই বহাল তবিয়তে আছে এবং পদ্মা অয়েলে অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

সূত্রমতে বর্তমান পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যাত্রীবাহী বিমান সংস্থাকেও জ্বালানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। গত ডিসেম্বরের শুরুতে টানা কয়েকদিন বাংলাদেশ বিমান, এমিরেটস, থাই এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারসহ অন্যান্য সংস্থার উড়োজাহাজে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি, যা যাত্রীদের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এএইচ