চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের মধ্যদিয়ে চলছে দেশের একমাত্র সরকারি মালিকানাধীন ‘জীবন বীমা কর্পোরেশন’। প্রতিষ্ঠানটিতে আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে খরচ করা হচ্ছে গ্রাহকের টাকা। কমিশন হাতিয়ে নিতে ভুয়া এজেন্ট দেখানোর মতো অনিয়ম চলছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে যেসব এজেন্টদের কমিশন দেওয়া হচ্ছে তার ৯০ শতাংশেরই অস্তিত্ব নেই। এজেন্ট হিসেবে ভুয়া নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা কমিশন বাবদ কোম্পানির টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা। ফলে গ্রাহকের বীমা দাবির টাকা পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে জীবন বীমা কোম্পানি। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাস শেষে প্রতিষ্ঠানটি ৯ হাজার ৯২৮ জন গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করতে পারেনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেষ ৭ বছরে জীবন বীমা কর্পোরেশন ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে সীমা লঙ্ঘন করে ২৬৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করেছে। এরমধ্যে শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৫ সালে অবৈধভাবে ব্যয় করা হয়েছে ৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে অবৈধভাবে ব্যয় করা হয় ৪৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে ৪৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৩৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ৪৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং ২০০৯ সালে ১৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করা হয়। অর্থাৎ বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ ব্যয়ের পরিমাণ।
ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে কোম্পানিটি অবৈধভাবে যে অর্থ ব্যয় করেছে তার ৯০ শতাংশ বীমা গ্রাহকরা (পলিসিহোল্ডার) এবং বাকি ১০ শতাংশ শেয়ার গ্রাহকদের (শেয়ারহোল্ডার) প্রাপ্য। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে কোম্পানির পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের আড়াই শ’ কাটি টাকার উপরে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহককে ফাঁকি দিতে অবৈধ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিবছর মোটা অঙ্কের পলিসি তামাদি করে দিচ্ছে সরকারি এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ১৮ হাজার ৫০৬টি পলিসি তামাদি করা হয়েছে। আগের বছর ২০১৪ সালে তামাদি হয় ২৪ হাজার ১৬২টি পলিসি। এছাড়া ২০১৩ সালে ২২ হাজার ২৫৭টি, ২০১২ সালে ২৪ হাজার ৭৯৫টি, ২০১১ সালে ২২ হাজার ১৫৪টি, ২০১০ সালে ৩৫ হাজার ২৪টি ও ২০০৯ সালে ১৯ হাজার ৪৯৬টি পলিসি তামাদি হয়ে যায়।
পলিসি তামাদি হওয়ার কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ে। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নবায়ন প্রিমিয়াম আয় কমেছে ২১ কোটি টাকা। ২০০৯ সাল থেকেই কোম্পানিটি নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ে এ দুরবস্থা বিরাজ করছে। বছরে নবায়ন প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশ আদায় করায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছে।
২০০৯ সালে জীবন বীমা কর্পোরেশনের নবায়ন প্রিমিয়াম আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পরের বছর ২০১০ সালে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। এরপর টানা তিন বছর আর ৫০ শতাংশ নবায়ন প্রিমিয়াম আয় করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এরমধ্যে ২০১১ সালে ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ, ২০১২ সালে ৪৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও ২০১৩ সালে ৪৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ নবায়ন প্রিমিয়াম আদায় করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
পরের বছর ২০১৪ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম আদায় হয় ৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ। তবে সদ্য সমাপ্ত ২০১৫ সালে তা আবার ৫০ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। ২০১৫ সালে এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানটি নবায়ন প্রিমিয়ামের ৪৭ দশমিক ১২ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে।
এদিকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করায় দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা। ফলে বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও প্রায় ১০ হাজার গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটি থেকে দাবির টাকা পাচ্ছেন না। আর গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় এবং মোটা অঙ্কের পলিসি তামাদি হয়ে যাওয়ার কারণে গ্রাহকের আস্থা হারিয়েছে কোম্পানিটি। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বীমা পলিসি বিক্রিতেও। ৬ বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির পলিসি বিক্রির সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
২০০৯ সালে জীবন বীমা কর্পোরেশন বীমা পলিসি বিক্রি করে ৫৯ হাজার ১৩৩টি। যা শেষ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৬৩৭টিতে। প্রতিষ্ঠানটির পলিসি বিক্রি কমেছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১১ সালে বীমা পলিসি বিক্রি হয় ৪৪ হাজার ৪৬৬টি। পরের বছর ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ৫৮৪টি। ২০১৩ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৫৯৬টিতে। আর ২০১৪ সালে বীমা পলিসি বিক্রি হয় ৩৫ হাজার ৬০২টি।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, কর্পোরেশন থেকে জানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে ৫০ হাজারের ওপর এজেন্ট কর্মরত আছে। তবে এদের বেশিরভাগই নামমাত্র এজেন্ট। মূলত যারা কাজ করছেন তারা অন্যদের নাম ব্যবহার করে কমিশন গ্রহণ করছেন।
আর কর্পোরেশনটির এজেন্টদের বিষয়ে আইডিআরএ’র কাছে যে তথ্য আছে তাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে ৬ হাজার ৭১৪ জন এজেন্ট কাজ করছে এবং তাদের তত্ত্বাবধানের জন্য কোনো এমপ্লয়ার অব এজেন্ট নেই।
এ বিষয়ে এক নথি থেকে দেখা যায়, এজেন্টদের এমন চিত্রে কাজে নিয়োজিত ৬ হাজার ৭১৪ জন এজেন্টদের সক্রিয়তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ।
তিনি বলেন, জীবন বীমা কোম্পানির এজেন্টরাই মূলত ব্যবসা সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে এজেন্টদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। কিন্তু জীবন বীমা কর্পোরেশনে এজেন্ট নেই বললেই চলে।
শেফাক আহমেদ বলেন, কর্পোরেশনের ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যবসার জন্য ডেভেলপমেন্ট অফিসার পায় ৫৬ হাজার ৪শ’ টাকা। আর এজেন্ট পায় ৫৩ হাজার ৫৫০ টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যবসার জন্য ডেভেলপমেন্ট অফিসার ও এজেন্টরাই নিয়ে যায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৫০ টাকা। এক্ষেত্রে ব্যবসা মানসম্পন্ন না হলে প্রতিষ্ঠানের কিছুই থাকবে না।
প্রতিষ্ঠানটিতে এজেন্ট ও তাদের তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তাদের কাঠামোতে ত্রুটি আছে উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, একজন এমপ্লয়ার অব এজেন্টের অধীনে ১৮ জন এজেন্ট থাকবে এটিই আদর্শ অনুপাত। কিন্তু জীবন বীমা কর্পোরেশনে এ নিয়ম একদমই মানা হয়নি।
এদিকে বীমা আইনের ৫৯(৬) ধারায় বলা হয়েছে, এজেন্ট ছাড়া অন্য কাউকে কমিশন বা অন্যকোনো নামে পারিশ্রমিক বা কোনো পারিতোষিক দেওয়া ও দেওয়ার চুক্তি করা এবং আইন অনুসারে নির্ধারিত হারের বেশি কমিশন দেওয়া বা গ্রহণ করার শাস্তি সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা।
আর বীমা আইনের ৫৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, এজেন্ট ছাড়া অন্য কাউকে কমিশন বা অন্য কোনো নামে কোনো পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক দেওয়া বা দেওয়ার চুক্তি করা যাবে না। ১২৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, এজেন্টকে অব্যশ্যই সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটি দায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করছে। কর্পোরেশনের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপন ও বিক্রি করা পলিসির সঠিক বোনাস হার নির্ণয়ের জন্য ২ বছর পর পর দায় মূল্যায়নের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ২০১০ সাল থেকেই এই কর্পোরেশনটির দায় মূল্যায়নের জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এতে একদিকে প্রকৃত হারে বোনাস পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পলিসি গ্রাহকরা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক শক্তি কতটুকু তাও নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এসব অনিয়মের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জীবন বীমা কর্পোরেশনের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘জীবন বীমা কর্পোরেশনে প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে খরচ করা হচ্ছে এ ধরনের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। এছাড়া পলিসি তামাদি হয়ে যাওয়া ও নবায়ন প্রিমিয়াম আদায় কম হওয়ার বিষয়টিও আমি জানি না। আমি নতুন যোগদান করেছি। তাই এ মুহূর্তে সবকিছু খতিয়ে না দেখে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
এআইজে





