বাংলাদেশের সাথে সার্কভূক্ত সদস্য দেশগুলোর বাণিজ্য বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষত গত ১০ বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের পাহাড়সহ বাণিজ্য ঘাটতি বিরাজ করছে। পণ্যে রফতানি চেয়ে ক্রমবর্ধমান হারে আমদানির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গত অর্থবছরে (২০১৩-১৪) সার্কভুক্ত সাতটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১১ কোটি ৭৫ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কেবল ভারতের সঙ্গে এককভাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৫৫৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

জানা গেছে, সার্কভুক্ত সাতটি দেশে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৫৬ কোটি তিন লাখ ডলার। একই সময়ে আমদানি করা হয়েছে ৬৬৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পণ্য। সে হিসাবে সার্ক অঞ্চলে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬১১ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কেবল মালদ্বীপে ১২ লাখ এবং আফগানিস্তানে ১৭ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যে মালদ্বীপে বাংলাদেশের রফতানি ও আমদানির পরিমাণ যথাক্রমে ১৭ লাখ ও ৫০ হাজার মার্কিন ডলার এবং আফগানিস্তানে রফতানি ও আমদানির পরিমাণ যথাক্রমে ৩৬ লাখ ও ১৯ লাখ মার্কিন ডলার।

ভারত থেকে গত এক বছরে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে ৬০৩ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলার সমমানের পণ্য। এর বিপরীতে রফতানি করা হয়েছে মাত্র ৪৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য।

গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের সঙ্গে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ঘাটতি ভারতের সঙ্গে ৫৫৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার, পাকিস্তানের সঙ্গে ৪৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে চার কোটি ৯৯ লাখ ডলার, নেপালের সঙ্গে ৭৮ লাখ ডলার, ভুটানের সঙ্গে দুই কোটি ছয় লাখ ডলার এবং মালদ্বীপের সঙ্গে উদ্বৃত্ত ১২ লাখ ডলার, আফগানিস্তানের সঙ্গে ১৭ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে।

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদে বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ফোরাম সাফটা ও সাটিসের মাধ্যমে এ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।

রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশের সাথে সার্ক দেশগুলোর বাণিজ্য বৈষম্যের পরিমাণ ছিল ৩১৯৪.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময়ে সার্কদেশগুলো হতে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৬১৫.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ এই বিশাল আমদানির তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানী করেছে মাত্র ৪২০.৫৫ মার্কিন ডলার।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের সাথে সার্ক দেশগুলোর বাণিজ্য বৈষম্যের পরিমান ছিল ১২৩৭.৭৬ মার্কিন ডলার কিন্তু এর পরের অর্থবছরে (১৯৯৯-২০০০) এর পরিমাণ কিছুটা কমে এসে দাঁড়ায় ৮২৫.৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আবার ২০০০-০১ অর্থবছরে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১১৯৮.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরের অর্থবছরে (২০০১-০২) পূনরায় কমে ১০১৬.৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়।

এরপরের অর্থবছরগুলোতে ২০০২-০৩ সালে বণিজ্যে বৈষম্যের পরিমান ছিল ১৩২১.৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ২০৭৭.৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ছিল ১৯৬০.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১৭২৭.৪৮ মার্কিন ডলার, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ২১২৭.২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এসে একলাফে এই ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৩২৪৫.৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ সালে আবার কিছুটা নেমে এসে ২৮৪৬.৮৬ মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়।

ইপিবি’র পরিসংখ্যান মতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে সার্ক দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিমাণ ছিল ৪২০.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা দেশের মোট রফতানি আয়ের ২.৬০ শতাংশ। মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ১৬২০৪.৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বর্তমানে সার্কদেশগুলোর মধ্যে ভারতের সাথেই সর্বোচ্চ বাণিজ্য বৈষম্যে রয়েছে বাংলাদেশের। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে রপ্তানী করেছে ৩০৪.৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ সময় ভারত থেকে আমদানি পরিমাণ ছিল ৩২১৩.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল অংক। এই সময়ে ভারতে সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ দঁড়িয়েছে ২৯০৯.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যবাণিজ্যে ভারসাম্য আনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও কমছে না বাণিজ্যঘাটতি। ভারতীয় আমদানিকারকদের বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে শুল্ক লাগে না। এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও গত অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে অনেক। এ কারণে বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলছে, যা গত ১০ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১৯৭ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে ২৭ শতাংশ এবং রফতানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। গত অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে ৬০৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার মূল্যমানের পণ্য। এর বিপরীতে ভারতে ৪৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করা হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে (২০১৩-১৪) বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

আগের বছর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৭৪ কোটি সাত লাখ ডলার। পক্ষান্তরে রফতানি আয় হয়েছিল ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়ায় ৪১৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এর আগের বছর ২০১১-১২ অর্থবছরে এই পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয় ৪৭৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার এবং রফতানি আয় ছিল ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়ায় ৪২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪০৬ কোটি ২৪ লাখ, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৯০ কোটি নয় লাখ, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২৫৮ কোটি ৭০ লাখ, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ১৯৩ কোটি ৬৬ লাখ, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১৬০ কোটি ৬৫ লাখ এবং ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১৮৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার মূল্যের বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছে, তার ছয় ভাগের এক ভাগই আনছে ভারত থেকে। ভারত থেকে টেক্সটাইল পণ্য, সবজি ও খাদ্যপণ্য, যানবাহন ও এর যন্ত্রাংশ, তামাক ও তামাকজাত পণ্য, ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ, মেশিনারি পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের ধাতবজাত পণ্যও বাংলাদেশ আমদানি করছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, চামড়া, ওভেন গার্মেন্ট, কৃষিজাত পণ্য, সিমেন্ট, ইট, পাথর, জামদানি শাড়ি এবং ব্যাটারিসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতে রফতানি করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি বাণিজ্যের তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ার কারণে ভারতের সঙ্গে এ দেশের বাণিজ্যঘাটতি কমানো সম্ভব হচ্ছে না, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এফবিসিসিআই সূত্র জানিয়েছে, ভারত নিজেই আমদানির চেয়ে রফতানি করে বেশি। বাণিজ্যিক ভারসাম্য আনতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশের রফতানি বাড়াতে হবে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ট্যারিফ-নন ট্যারিফজনিত সমস্যা, ল্যাবরেটরি টেস্ট, ভিসা পেতে বিলম্ব, বেশি রফতানি করা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বেসকারিভাবে ভারতে রফতানি বাড়াতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিক উৎপানশীলতা ও পণ্য বৈচিত্রের অভাব, গুনাগতমান এই ক্ষেত্রে সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘতর হচ্ছে।

এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী টাইম নিউজ বিডিকে বলেছেন, প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতকে আরো উদার হতে হবে। তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার বিশেষ করে চাল, ডাল, পিয়াজ, আলু ব্যাপকভাবে ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে। যে পরিমাণ আমদানি হচ্ছে আমরা সে পরিমাণ রফতানি করতে পারছি না।

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর