রমজানে নিত্যপণ্যের দাম কিছুতেই কমছে না। বেগুনের দাম বাজারভেদে ১০০ টাকাও স্পর্শ করেছে। ৪০ টাকার শসা হয়েছে ৫০ টাকা। বেড়েছে করল্লা, মরিচ, পেঁপে ও পটলের দামও। এ ছাড়া পোলাওর চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

শনিবার এক কেজি পোলাওর চাল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। পাশাপাশি বাড়ছে মসলাজাতীয় পণ্যের দাম। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি আদা ১৮০ টাকা ও ভালো মানের ২০০ টাকা। বিদেশি আদা (চায়না) ২২০ টাকা, রসুন মানভেদে ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, কাঠবাদাম, কিশমিশ, চিনাবাদাম, জিরা, আদা, সব মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। ক্রেতারা দাবি করছেন, জিনিসপত্রের দামে আগুন লেগেছে।

এদিকে পণ্যের দাম কমাতে সরকারের উদ্যোগ কাজে আসছে না। বাজারে পণ্যের দাম কমাতে সরকার যে কৌশল নিচ্ছে ভিন্ন অপকৌশল নিচ্ছে বিক্রেতারা। ফলে কমানোর উদ্যোগের ফলাফল পুরোপুরি ক্রেতাদের ঘরে যাচ্ছে না। বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে পণ্য। এর ধারাবাহিকতায় বেড়েছে পেঁয়াজ, বেগুন, ডাল ও নতুন করে বেড়ে চলেছে মসলার দাম।

রাজধানীর ফকিরাপুল, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর, মালিবাগ, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট-কলমিলতা বাজার ঘুরে দেখা গেছে পণ্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের বাজারের গেটে পণ্যের তালিকা ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ থাকলেও তা হাল-নাগাদ করা হচ্ছে না। আর ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) কম দামে পণ্য বিক্রি প্রাধান্য পাচ্ছে ক্রয়ক্ষমতা আছে-এমন মানুষের কর্মক্ষেত্রের আশপাশে। ফলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের উদ্যোগ পুরোপুরি কাজে আসছে না।

টিসিবির উদ্যোগে চিনি ৪৩ টাকা, মসুর ডাল ৬৫ টাকা, ছোলা ৪৪ টাক, সয়াবিন (বোতলজাত) ১০৬ টাকা এবং খেজুর বিক্রি করা হচ্ছে ৭০ টাকায়। বাজারে এসব পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতেই টিসিবির এ উদ্যোগ। কিন্ত বাজারে টিসিবি রাজধানীর বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এসব পণ্য বিক্রিতে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে মতিঝিল, প্রেসক্লাব-সচিবালয়ের মতো বেশি ক্রয়ক্ষমতা সম্পন্ন এলাকার মানুষের কর্মক্ষেত্র সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। অন্য এলাকাগুলোতে তুলনামূলক কম।

রাজধানীর বাজারে নতুন করে বেড়েছে পেঁয়াজ, বেগুন, ডাল ও মোটা চালের দাম। গত সপ্তাহের ৮০ থেকে ১০০ টাকার বেগুন উঠেছে ১১০ টাকায়। পেঁয়াজ উঠেছে ৪৩ টাকা পর্যন্ত। আমদানি করা বড় পেয়াজ ও দেশি ছোট পেঁয়াজ একই দামে বিক্রি হচ্ছে। ১০০ টাকার মাসকলাইয়ের ডাল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি। আর ১০৫ টাকার মসুর ডাল ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকা পর্যন্ত। তবে কেজিতে ৩ টাকা কমেছে ছোলার দাম।

রোজার শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে অন্য সব পণ্য। বেশন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১১০ টাকা কেজি। ধনেপাতা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি, শসা ৫০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি বরবটি, পটল ৪০ টাকা এবং ভেন্ডি ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আগের বৃদ্ধি পাওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে আরও কিছু সবজি। এরমধ্যে কচুরমুখি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি, লতি ৪৫ টাকা, পেপে ২৫ টাকা কেজি ও প্রতিকেজি ঝিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দামে। দেড় থেকে দুই কেজির ওজনের লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ৮০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি ওজনের চালকুমড়া (জালি) বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। মরিচের কেজি ৬০ টাকা।

ঈদ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মসলার দাম বাড়ছে। রাজধানীর বাজারে দেখা গেছে হলুদ ১৪০ থেকে ২০০ টাকা কেজি, শুকনো মরিচ ১৫০ থেকে ২২০ টাকা কেজি, প্রতি ১০০ গ্রাম জিরা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ১০০ গ্রাম তেজপাতা ১৫ টাকা, ১০০ গ্রাম গোলমরিচ ৬৫ টাকা, ১০০ গ্রাম এলাচ ১২ টাকা এবং ধনিয়া ১৫ টাকা।

আগে বৃদ্ধি পাওয়া সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে আদা। প্রতিকেজি চীনা আদার কেজি ২৫০ টাকা, দেশি আদা ১২০ টাকা এবং মায়ানমার ও ভারত থেকে আমদানি করা প্রতিকেজি আদার দাম ১৭০ টাকা। আমদানি করা বড় রসুনের কেজি ৮০ টাকা, ছোট রসুন ৪৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। মসুর ডাল (ছোট) ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। আমদানি করা মসুর বড় ডালের কেজি ৮০ টাকা। ডিমের হালি ৩০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকা কেজি, গরুর মাংস ৩০০ টাকা, খাসির মাংস ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকাতে বিক্রি হচ্ছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অফ বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ১১৫ শতাংশ, দেশি পেঁয়াজের দাম ৭৭ শতাংশ, রসুনের দাম ১৬ শতাংশ, শুকনো মরিচ ৪০ শতাংশ, হলুদ ৭৮ শতাংশ, আদা ৪০ শতাংশ এবং জিরার দাম ২ শতাংশ বেড়েছে।

মাছের দাম কমছে না। রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে মাছের দাম বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করে। এখন পর্যন্ত মাছের দাম চড়া। যদিও মাছের বাজারে সরবারহ প্রচুর। শুক্রবার রাজধানীর বাজারে দেখা গেছে প্রতিকেজি মাঝারি ধরনের কাতল মাছের দাম ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ২২৫ টাকা, মাঝারি রুইয়ের কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তবে বড় রুই, কাতল ও বোয়ালের কেজি ২৫০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। কই মাছের কেজি ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত, তেলাপিয়া আকার ও ধরন ভেদে ১১০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত, দেশি মাগুর ৪০০ টাকা।

পাঙ্গাসের কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। কাঁচকি মাছের কেজি ২৫০ টাকা, এক কেজি সিলভারকাপ মাছের দাম দাম ১১০ টাকা। ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের ইলিশের দাম ৩৫০ টাকা; ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ১২০০ টাকা থেকে ওপরে। কোন কোন বাজারে ইলিশ মাছ চোখেই পড়েনি।

রোজাতে চালের বাজার আগের মতই থাকার কথা থাকলেও এবার মোটা চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা চালের ৩০ টাকা কমেছে। তবে খুচরা বাজারে এর প্রভাব এখনো পড়েনি। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ভালোমানের মিনিকেট চাল বিক্রি হতে দেখা গেছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা। মধ্যম মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা কেজি; পারি ও স্বর্ণা খ্যাত মোটা চাল ৩৬ টাকা; বিআর-আঠাশ ৩৮ থেকে ৩৯ টাকা। পোলাও এর চালের কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট আটার দাম ৭০ টাকা। খোলা আটার কেজি ৩২ টাকা এবং খোলা ময়দার কেজি ৪০ টাকা। ছোলার কেজি ৬০ টাকা। ছাল ছড়ানো ছোলার কেজি ৭০ টাকা। ভোজ্য তেলের লিটার ১১৫ টাকা, সুপার ৮০ টাকা। নতুন করে বাড়েনি এ সব পণ্যের দাম।

ক্রেতারা বলছেন, প্রতিদিন সবজির দাম বাড়ছে। দাম বাড়তে থাকায় তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দোকানিরা বেশি দামে বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।

ঢাকা, ১২ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর