বিএনপি জোটের টানা অবরোধে নতুন সংকটে পড়েছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা। দিন দিন ফুরিয়ে আসছে এ খাতের কাঁচামালের মজুদ। যেকোনো সময়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে শতাধিক কারখানার।

বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় প্রতিদিন গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। নিত্য নতুন শঙ্কা নিয়ে গার্মেন্টস খাত চতুর্মুখী সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

সুতা, কাপড়, বোতাম, জিপার (চেইন), রঙ, তৈরি শার্টের জন্য কভার বক্স ও কাগজ, প্যাকেজিংয়ের কার্টুন উপকরণই হল রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসের কাঁচামাল। গার্মেন্টস ভেদে এই উপকরণগুলো ১৫ থেকে ২০ দিনের মজুদ রাখা হয়।

কোনো কারণে সরবরাহ লাইনে সমস্যা হলে এখান থেকে চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলের ডাকা অবরোধে ভেঙ্গে পড়েছে এই সরবরাহ লাইন। কাঁচামাল ফুরিয়ে যাওয়ায় সংকটে পড়তে যাচ্ছে পোশাক প্রস্তুতকারী গার্মেন্টস খাত।

অনির্দিষ্টকালের অবরোধ পার করলো ২৫তম দিন। পাশাপাশি চলছে বিভিন্ন জেলায় থেমে থেমে হরতাল। পরিবহন সংকট ও অবরোধের জন্য থমকে গেছে সকল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।

ইতোমধ্যে পোশাক শিল্পের ৪০ শতাংশ অর্ডার বাতিল করেছে বিদেশি ক্রেতারা। অর্ডার কমে যাওয়ায় রপ্তানিও কমে যাচ্ছে। আর এ সবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রপ্তানির ওপর।

অবরোধে গার্মেন্টস খাতের সমস্যা বিষয়ে বিজিএমইএ’র অপর এক পরিচালক বলেন, তাৎক্ষণিক ক্ষতি সামাল দেয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিনের হরতাল বা অবরোধে পোশাকশিল্পের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার লোকসান হয়।

বিকেএমইএ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বায়াররা অর্ডার দিতে শুরু করেছিলো। কিন্তু, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বায়াররা এদেশে আসছে না। এছাড়া অনেকে তাদের অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্ডার বাতিল হয়েছে। এছাড়া চলমান অবরোধে পোশাক খাতের ৪’শ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলেও জানা য়ায়।

তিনি বলেন, আগে গাড়ির ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এখন দিতে হচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। তারপরেও প্রয়োজনীয় পরিবহন মিলছে না।

বিকেএমইএ জানায়, গত ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে বর্তমান রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা কারখানাগুলোতে ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটি এবং কমপ্লায়েন্সসহ সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ইতোমধ্যেই একটা অবস্থান তৈরি করেছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পোশাক খাতকে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিবে।

অবরোধ নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করা হলেও চলমান অবরোধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।

তবে পোশাকখাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবরোধ না থামা পর্যন্ত ক্রেতাদের নতুন করে অর্ডার দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে টাল-বাহানা করবে। অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণ খেলাপি হবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে অর্থনীতি। অতঙ্কের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন না শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশে তৈরী পোশাক শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০০০ সাল থেকেই পোশাক খাত মোট রফতানির তিন-চতুর্থাংশ অধিকার করে। অন্যদিকে রফতানিতে পাট খাত ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়।

বর্তমানে পোশাক রফতানির (ওভেন এবং নিটিং খাতের একত্রে) মোট রফতানিতে ৮১ দশমিক ১৭ শতাংশ (২০১৩-১৪ অর্থবছর) অবদান রয়েছে।

১৯৮১-৮২ সালে মোট পোশাক শ্রমিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ হাজার। আজ তার পরিমাণ ৪৫ লাখেরও বেশি।

১৯৭৮ সালে এদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩-৮৪ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৪টি। মাত্র ১২টি শিল্পকারখানা নিয়ে শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এ খাত।

২০১১ সালে আড়াই লাখেরও বেশি শ্রমিক ছাটাই করা হয়েছে। বর্তমানেও ছাটাই কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে। ফলে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি সরকার শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরী নির্ধারণ করে দিলেও তা থেকে বঞ্চিত ৬০ শতাংশ শ্রমিক।

পোশাক প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ বলেছে ২০১৩ সালে এপ্রিল মাসে সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকে ২১০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেকগুলো বন্ধের পথে রয়েছে।

প্রতিদিনই প্রায়ই দু-একটি করে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। রানা প্লাজা ধসের পর থেকে ২০৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধ হওয়া ২০৭টি কারখানার মধ্যে ২০ শতাংশ হচ্ছে শিফট হওয়া, ৪০ শতাংশ শেয়ার্ড বিল্ডিং কারখানা।

বাকী কারখানাগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানা। তবে এর মধ্যে ভালো মানের কারখানা ৫ শতাংশেরও কম। পারপাসমেড বিল্ডিংয়ের কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।

গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা এ খাতটি একের পর এক সংকটের মুখে পড়ছে। দেশে প্রস্তুতকৃত গার্মেন্ট পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।

কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে সময়মতো শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় বায়াররা সর্বনিন্ম ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দাবি করছেন।

সেই সঙ্গে থাকছে বিমানযোগে পণ্য পাঠানোর দাবি। বিমানযোগে পণ্য পাঠানো অনেক ব্যায়বহুল।

চট্টগ্রামে ছোট-বড় ৯০০টি গার্মেন্ট কারখানা থাকলেও বর্তমানে ৬৭০টি গার্মেন্ট পুরোদমে পণ্য উৎপাদনে রয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশরই প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কারখানা বা ব্যাক-আপ লিংকেজ নেই বললেই চলে।

রেডিও তেহরানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে চরম সংকটকাল চলছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কারখানা। রপ্তানিতেও নেমেছে ধ্বস।

এমকে