মূল্যস্ফীতির বড় ঝুঁকিতে এখন বাংলাদেশ। সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বলা হয়, ভারতের মূল্যস্ফীতি ক্রমশ বৃদ্ধি বাংলাদেশে ট্রান্সমিট হতে পারে। যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রীও স্বীকার করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে ভারত ও চীনের মূল্যস্ফীতির ঊর্র্ধ্বমুখী বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে নভেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। যেখানে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে এ বছর মূল্যস্ফীতির হার অনেক বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি আরও বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেকার ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ- এমন মন্তব্য অর্থনীতিবিদদের। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছেন তারা।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে এসব তথ্য। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নভেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে ভারত ও চীনের সঙ্গে। ২০১৬ সালে ভারতের মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৫ সালের এই মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এক বছরের মাথায় দেশটিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে দশমিক ৬ শতাংশ।

এ ছাড়া ২০১৪ সালে ভারতের মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। একইভাবে চীনের মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। দেশটিতে ২০১৬ সালে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ২ দশমিক ১ শতাংশ, ২০১৫ সালে ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ছিল ২ শতাংশ।

ওইসব দেশের মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার আশংকা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জ্বালানি তেল বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

এতে আরও উল্লেখ্য করা হয়, বিশ্ববাজারের মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ২০১৫ সালে ছিল দশমিক ৩ শতাংশ। যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৮ শতাংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অঞ্চলের মূল্যস্ফীতি একইভাবে ২০১৫ সালে দশমিক ১ শতাংশ থাকলেও ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরি টাইম নিউজকে বলেন, খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। কারণ চীন ও ভারতের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে দেশের ভেতর খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি যাতে না বাড়ে বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির সেদিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলেন, সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলে এবং পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন হলে মূল্যস্ফীতি হবে। তাই অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখা গেলে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কিছুটা সহনীয় থাকবে।

বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট হারে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। গ্রামের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ।

পাশাপাশি শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট হারে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

মাহমুদ