প্রতিবেশী দেশ থেকে গরু আসুক আর না আসুক, কোরবানী কিন্তু দিতেই হবে। মাত্র একদিন বাদেই অপেক্ষার পালা শেষ। তাইতো জমে উঠেছে রাজধানীর কোরবানীর পশুর হাটগুলো। তবে প্রকৃত দামে গরু বিক্রি করতে না পারায় মন ভালো নেই ব্যবসায়ীদের। পক্ষান্তরে সাধ্যের মধ্যে গরু না পাওয়ার অভিযোগ ক্রেতাদের।

রাজধানীর কোবানীর পশুর হাটগুলোর মধ্যে অন্যতম গাবতলী পশুর হাট। বুধবার সরেজমিনে দেখা যায় ক্রেতাদের বেশ সমাগম এই হাটে। বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতা আসলেও চাহিদা মতো দাম বলছে না। দেখার পর এক লাখ টাকা দামের গরু পঞ্চাশ হাজার টাকা বলে চলে যাচ্ছে।

বেলা দেড়টা। গাবতলী পশু হাটের পুলিশ কন্ট্রোল রুমের পেছন পাশ। গরুর লম্বা দুইটা সারি। তার বাম পাশের সারিতে মুখে হাত দিয়ে বসে আছেন আরমান মণ্ডল ওরফে মণ্ডল বেপারী। চারটি গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন কুষ্টিয়া থেকে। তিনটা গরু বিক্রির পর বাকি আছে একটি।

কথা হয়েছিলো তার সাথে। টাইমনিউজবিডিকে তিনি জানান, 'চারটার মধ্যে তিনটা গরু বিক্রি করিচি একটা আছে। এইডা বিক্রি করতি পারলি কানে মুড়া দেব, আর গরু নিয়ে ঢাকায় আসবো না। তিনটা বিক্রি করিচি তাও লচে। ছাইড়ে ছুইড়ে আসলটা আছে।'

'ভারতের গরুর দিকি কাস্টমারের চাহিদা বেশি। দেশি গরুর দাম কয় না। ভারতের গরু এবার বেশি আসিনি। তাও যা আইয়েচে তাতেই আমাইগে গাইড় মাইরে যাচ্চে' বলছিলেন মণ্ডল বেপারী।

তিনটা গরু নিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে এসেছেন মো. তোয়াক্কেল শেখ। নিজের হাতেই দশ মাস আগে থেকে লালন করেছেন গরু তিনটা। এসেছেন গত শুক্রবারে। একটা গরুও তিনি এখনো বিক্রি করতে পারেননি।

ভাঙ্গা মনে টাইমনিউজবিডিকে তিনি জানান, 'কাষ্টমাররা সব ভারতীয় গরুর মতো দাম কয়। আমার এই গরুটা আমি দশ মাস আগে ২ লাখ দশ হাজার টাকা দিয়ে কিনিচি। তার দাম এখন ১ লাখ কুড়ি হাজার টাকা কয়। এই গরুডায় কমপক্ষে ১৬ মোন গোস্ত আছে। তালি পরে মন হিসাব করলিউতো ১৬ হাজার টাকা মন হলি দাম আসে ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।'

ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন দেশে যে গরুর চাহিদা তা তারাই পূরণ করতে পারবেন। শুধু কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চল থেকে প্রতিবছর যে গরু আসে তাতেই দেশে গরুর আর্ধেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে তাদের ধারণা। তাদের একটাই দাবি, সরকার তাদেরকে গরু লালন-পালন করার জন্য সহযোগীতা করুক।

কুষ্টিয়া সদর থেকে এসেছেন হাশেম বেপারী। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বললেন, 'এই হটের অর্ধেকের বেশি গরু কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে আইচে। আমাইগে অঞ্চলে অনেক গরুর খামার আচে। আমাইগে দিরি যে খামার আচে তা যদি ভলো কইরে করা যায়, তালি পরে ভারত থেকে আর গরু আনা লাগে?'

পাবনা থেকে পনেরোটা গরু নিয়ে এসেছেন আলীম বেপারী। টাইমনিউজবিডিকে তিনি বলেন, 'লাভ নাইরে ভাই লাভ নাই। আমি পঁচানব্বই সাল থাইকে এই হাটে আসি। আগের মতো সিরাম দামি খদ্দের দেহিনা।'

তবে গণমাধ্যমের প্রতি অখুশি হয়ে আরেক বেপারী মো. করম আলী টাইমনিউজবিডিকে বললেন, একাক টিবি একাক রহম কয়। এই টিবিরাই তো আমাইগে গাইড় মাইরে দিলো। শুধু কয় ভারতীয় গরু না আসাতে ব্যবসায়ীদের ভলো বেঁচাকেনা হচ্ছে। আমার কাছে আইসে শুনুক, আমি ভালো করে কবানে। গরু আসিনি? এই হাঠে যত গরু আছে তার অর্ধেকের বেশি ভারতের। তাও আবার রোগাইটে। হাপানি আর মুখ দিয়ে লালা ঝরে। আমার গরু দেখেনদি। কোন লালা আছে?'

'আমাইগে দ্বারা আর গরু পুষা হবে না। গত বছর ২ লাখ টাকার গরু ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করিচি। কয়ডা বছর ধরে শুধু লচ যাচ্ছে। ঈদ আসলি আমাইগে দেশের লোকজন সব হাজি হয়। সব ভারতীয় গরু কেনে। আর আমাইগে হাতে হারিকেন পুঙ্গায় বাঁশ' বলছিলেন করম বেপারী।

তাদের ব্যবসায় ক্ষতি এবং প্রকৃত দাম না পাওয়ার কারণ হিসেবে গরু পালনের অনুষঙ্গিক দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়াকে তারা দায়ি করলেও তাদের একটাই ক্ষোভ ঈদের আগ মূহুর্তে ভারত থেকে গরু আসা। তারা বলছে, ভারত থেকে তো গরু আসলে তা অন্য সময় আসুক। কিন্তু ঈদের সময় না।

তাদের সাথে মতের মিল রেখে অনেক ক্রেতাই একই কথা বলছেন। এক ছেলে ও এক সহোযগীকে সাথে নিয়ে গরু কিনতে এসছেন সরকারি অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সাঈদী। টাইমনিউজবিডিকে তিনি জানান, 'গরু কিনতে এসে একটু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সাধ্যের মধ্যে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।'

তিনি বলেন, 'ভারতীয় গরু আসার পরও দাম কমছে না। তবে আমি কখনও ভারতীয় গরুর পক্ষে না। কারণ ওগুলো বিভিন্ন রোগে রোগাক্রান্ত থাকে। আমাদের দেশীয় খামারিদের প্রতি নজর বাড়াতে হবে। তাহলে দেশের গরুর চাহিদা আমাদের দেশীয় খামারিরাই পূরণ করতে পারবে। তাতে করে দামটা একটু কমবে।'

গরু কিনতে আসা আর এক ব্যক্তি মো. রানা। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। টাইমনিউজবিডিকে তিনি বললেন, 'গরুর বেপারীরাও চায় লাভ করতে আবার অন্য দিকে ক্রেতারাও চায় লাভে কিনতে।' তবে তিনি ভারতীয় গরুর থেকে নেপালী গরু বেশি বলে দাবি করলেন।

তবে ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী যে গরুর মুখ দিয়ে লালা ঝরে এবং হাপানী আছে সেই সব গরুর সবই মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। যার অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আসে এবং যেগুলো বিভিন্ন রোগে অক্রান্ত থাকে।

এ ব্যাপারে কথা হয়েছিলো প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় গাবতলী হাটের অস্থায়ী ভেটেনারী চিকিৎসা কেন্দ্রের দ্বায়িত্বরত ডা. মো. আমির হোসেনের সাথে। টাইমনিউজবিডিকে তিনি বলেন, 'আমাদের কাজ হলো গরুগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া। তাছোড়া মোটাতাজাকরণের ট্যাবলেট না খাওয়ানো এবং তা যেন বাজারে বিক্রি না করা হয় সেদিকে নজর রাখা।'

তিনি বলেন, 'আমরা প্রতিটা গরুকে পরীক্ষা করে হাটে ঢোকাচ্ছি। প্রাথমিক ভাবে গরু পরীক্ষার পর যেটা পাচ্ছি সেটা হলো ক্ষুদা মন্দা।'

কতজন কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি মূল ডাক্তার এবং আমার সাথে দুজন সহযোগী রয়েছে। তবে ঢাকা শহরে ১৭টি হাটে মোট ১৭ জন ডাক্তার কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।'

ভারতীয় গরুর ব্যাপারে তিনি বলেন, 'যখন ভারত থেকে গরু আনা হয় তখন পরীক্ষা করেই ঢোকানো হয়। সীমান্তে আমাদের কোয়ারেনটাইন অফিস আছে যার মাধ্যমে সকল গরু পরীক্ষা করেই ঢোকানো হয়।'

এখনো পর্যন্ত এই হাটে কোন ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত গরু এবং ভারতীয় গরু পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

এমআর/ এআর