৭ মাসের অধিক সময় পর ফের দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। সোমবার দিনশেষে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২ কোটি ৩৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। রবিবারের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ২১৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর সর্বশেষ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল ডিএসইতে। ওইদিন লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
অবশ্য ২০০৯ সালের ২ জুলাই ডিএসইতে প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। ওইদিন লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল ডিএসইতে।
মূলত ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বরের পর ধস শুরু হয় শেয়ারবাজারে। ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে লেনদেন নেমে আসে ১০০ কোটি টাকার ঘরে। তারল্য সংকট আর দরপতনের বৃত্তেই গত কয়েক বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে শেয়ারবাজার। মাঝেমধ্যে নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাজারে গতি ফিরে আসলেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দরপতনের পুরনো চেহারায় ফিরে গেছে বাজার।
চলতি বছরের শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে তারল্য সংকট ও দরপতনে অনেকটাই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দেশের শেয়ারবাজার। এর মধ্যে শেয়ারবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট সংক্রান্ত ইস্যুতে সংকটের গভীরে নিপতিত হয় বাজার। ৪ মে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে আসে ৪ হাজার কোটি টাকার নিচে।
এমন পরিস্থিতিতে নড়েচেড়ে বসে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলিাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসে বিএসইসি। বৈঠকে বাজারের সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগের আশ্বাস দেয় বিএসইসি। পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে বাজার সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয় বিএসইসির পক্ষ থেকে। এরপর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের আহ্বান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্য শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। উপরন্তু সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কারণে শেয়ারবাজারে লেনদেনে গতি ফিরতে শুরু করে।
এর মধ্যে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কমিয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক লিমিটেডে স্থায়ী আমানতের সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমানো হয়েছে। ১ জুন সোমবার থেকে নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে।
মূলত এ সবই শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে অতি উৎসাহী না হয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী বলে মনে করছেন তারা।
ডিএসইর সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, লেনদেন বাড়ছে এটা সুসংবাদ। এতে বিনিয়োগকারীরা যেমন লোকসানের পরিমাণ কমাতে পারছে, ঠিক একইভাবে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মধ্যে প্রাণ ফিরে আসছে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবে শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত হয়ে গেছিল। যা আর কমার জায়গা ছিল না। তবে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আবার আস্থা ফিরে আসায় বাজার ইতিবাচক গতি ফিরেছে। আর এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সবাইকে যার যার জায়গা থেকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এদিকে লেনদেনের পাশাপাশি সূচক বৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত রয়েছে। রবিবারের তুলনায় ৩৬.৬৭ পয়েন্ট বেড়ে দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৬২৩.৬৩ পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। লেনদেন হওয়া ৩১৯টি ইস্যুর মধ্যে দিনশেষে দর বেড়েছে ১৫৫টির, কমেছে ১১৬টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৮টির দর।
এদিকে রবিবার রেকর্ড ডেটের কারণে বন্ধ থাকার পর সোমবার লেনদেনের শীর্ষ জায়গা দখল করে নিয়েছে খুলনা পাওয়ার। শুধু তাই নয়, ১০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে শুধু এ কোম্পানির শেয়ার। দিনশেষে কোম্পানিটির ১০২ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে থাকা সামিট পাওয়ারের লেনদেন হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৮ লাখ ৩ হাজার টাকা। ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে গ্রামীণফোন।
লেনদেনে এরপর রয়েছে যথাক্রমে— বেক্সিমকো, সাইফ পাওয়ারটেক, বারাকা পাওয়ার, সামিট পূর্বাঞ্চল পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, মবিল যমুনা।
এদিকে ডিএসইতে হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলেও এক শ’ কোটি টাকার ঘরেও লেনদেন হয়নি দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই)। লেনদেনের পরিমাণ তো বাড়েনি বরং কমেছে। রবিবার ৯৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা লেনদেন হলেও সোমবার তা হয়েছে ৭৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তবে লেনদেন কমলেও বেড়েছে সূচক। রবিবারের তুলনায় ১৫.২৮ পয়েন্ট বেড়ে দিনশেষে সিএসইএক্স ৮৬৬৯.৩৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১১৯টির, কমেছে ৯১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩১টির দর।
এএইচ





