শীতের সবজির উৎপাদন ও সরবরাহ প্রচুর। কিন্তু তারপরও দাম সাধারণ ক্রেতাদের হাতের নাগালে আসেনি।

এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। দূর-দূরান্ত থেকে সবজি ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পরিবহন খরচ বাবদ ব্যয় হয় অনেক টাকা। তার ওপর পাইকারি বাজারে সক্রিয় রয়েছে সিন্ডিকেট।

এভাবে কয়েক হাত বদলে পর্যায়ক্রমে দাম বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে আসতে দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায়।

এসব দেখার যেন কেউ নেই। এই সুযোগে যে যার মতো করে আদায় করে নিচ্ছে অতিরিক্ত দাম। রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি সবজি বাজার কারওয়ান বাজার এবং সবজি উৎপাদনে সমৃদ্ধ কয়েকটি জেলার খবরে উঠে এসছে এ চিত্র।

রাতের কারওয়ান বাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য সবজি বোঝাই ট্রাক আসছে ঢাকায়। রাতেই মূলত এসব ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে।

পাইকারি আড়ৎ কারওয়ান বাজারে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই এ সবজি চলে যায় নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটদের হাতে। আর এসব সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কয়েক দফা হাতবদলে বেড়ে যাচ্ছে সবজির দাম।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রো-ন-১৪০৩১৬ ও বগুরা-ট-১১০৩০ দুটি সবজি বোঝাই ট্রাক প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে এক দল ব্যবসায়ী ট্রাকটি ঘিরে ধরে। কয়েক মিনেটেই দর-দাম বিক্রি শেষ।

এভাবে ট্রাক থেকে সবজি নামানোর আগেই কয়েক দফা বিক্রি হয়। আলাপ করে জানা যায়, বগুড়া থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের এ সবজি পরের দিন (বুধবার) পাইকারি দামে বিক্রি করা হবে।

জানা গেছে, এলাকাভিত্তিক প্রত্যেক কাঁচাবাজারের বিক্রেতা প্রতিনিধিদের নিয়ে এ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন রাতে সবজি কিনতে এসে সিন্ডিকেটের সদস্যরা একত্রিত হন।

এ সময় সবাই মিলে পরদিন কী দরে সবজি বিক্রি হবে তা নির্ধারণ করে নেন। দর নির্ধারণ হয়ে গেলে এলাকাভিত্তিক বাজারের বিক্রেতাদের নির্ধারিত দর নিজ নিজ প্রতিনিধি জানিয়ে দেন।

আর পরদিন সিন্ডিকেটের নির্ধারিত দরেই সবজি বিক্রি করেন বিক্রেতারা। কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা মালিবাগ কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর টাইম নিউজকে জানান, ‘রাজধানীর সব কাঁচাবাজারের প্রতিনিধিকে নিয়ে আমাদের সমিতি আছে।

সমিতির সবাই রাতে কারওয়ান বাজারে একত্রিত হন। সেখানেই নির্ধারিত হয় আমরা কী দরে সবজি বিক্রি করব।’

পাইকারি কেনা-বেচা নিয়ে কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী নজরুল টাইম নিউজকে বলেন, এখানে দুই ভাবে সবজির কেনা-বেচা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ট্রাক বোঝাই করে সবজি এখানে নিয়ে এসে আড়ৎগুলোতে বিক্রি করে।

আবার আড়ৎদাররা সরাসরি বিভিন্না এলাকা থেকে সবজি কিনে এখানে এনে বিক্রি করে। সবজির সিন্ডিকেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো সিন্ডিকেট না।

অমরা কৃষকদের কাছ থেকে কিনে আনি, এর সঙ্গে পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খরচ হিসাব করে সামান্য লাভে বিক্রি করি।’

রাত ১১টার দিকে দেখা গেল পাশেই একটি মিনি ট্রাক থেকে টমেটো, বাঁধাকপি ও ফুলকপিসহ অন্যান্য পণ্য নামানো হচ্ছে। ট্রাক ড্রাইভার আকরাম জানান, সাভার থেকে এসব সবজি আনা হয়েছে।

ভাড়া কত জানতে চাইলে জানায় দুই টন সবজি কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ভাড়া ঠিক হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। বগুড়া থেকে সবজি বিক্রি করতে কারওয়ান বাজারে এসেছেন গোলাম সরদার।

তিনি বলেন, শুধু পরিবহন ভাড়া বাবদই কেজিতে অতিরিক্ত আড়াই থেকে ৩ টাকা বেশি যোগ হয়। এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যয় তো আছেই। তার মতে, পরিবহন ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।

এরাই ভাড়া নির্ধারণ করে। আর কম ভাড়ায় কোনো ট্রাক বা পিকআপভ্যান এলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় মালিক সমিতি।

পাইকারি থেকে খুচরায় বড় ফারাক বিভিন্ন সবজি কেজিপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ টাকা ব্যবধানে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।

মঙ্গলবার সরেজমিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি দামে ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে আকার ভেদে ১৫ থেকে ২৫ টাকা। বাঁধাকপি ১৫ থেকে ২৬, টমেটো ৩০ থেকে ৩৫, মুলা ২০ থেকে ২৫, লাউ ২০ থেকে ২৫, কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৫০ টাকা ও শিম ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে পাইকারি দামের তুলনায় সবজি দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

প্রতি পিছ ফুলকপি আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬৫ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, প্রতি কেজি টমেটো মান ভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, মুলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, লাউ ৪৫-৫০ টাকা। এ ছাড়া লাল শাকের আঁটি ২০-৩০ টাকা, ধনে পাতা (১০০ গ্রাম) ৩৫-৪৫ টাকা, ছোট আকারের মিষ্টি কুমড়া ৩৫-৪৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে জিম্মি কৃষক ।মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন নরসিংদীর কৃষকরা। এই চক্রের কারসাজির কারণেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা।

ফলে সবজি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন এই এলাকার কৃষকরা। জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ৪০ শতাংশ সবজির চাহিদা মিটিয়ে থাকেন নরসিংদীর শিবপুর, জঙ্গী শিবপুর, সৃষ্টিগড়, কোন্দারপাড়া, নারায়নপুর ও রায়পুরা এলাকার কৃষকরা।

সবজি চাষের এই ভরা মৌসুমে তাদের উৎপাদিত পণ্যের আশানুরূপ মূল্যে না পেয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে তাদের মধ্যে।

কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ক্ষেত থেকে সবজি ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরুর কথা শোনা গেলেও আজও ওই প্রক্রিয়া কৃষি অধিদফতরের ফাইলে বন্দি আছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা।

বিটিমরজাল গ্রামের সবজি চাষী আমির হোসেন (৪৫) এক বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘বেশি দামে সার ও কীটনাশক কিনে জমিতে দিতে হয়েছে।

এই মৌসুমের প্রথমে বাজারে ভালো দাম থাকলেও মধ্যস্বত্বভোগী দালাল সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য মূল্যটুকুও পাচ্ছি না।’ বগুড়ায় বর্তমান রবি মৌসুমে আগাম সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে।

প্রতিদিন সবজি ভর্তি সারি সারি ট্রাক রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মোকামে যাচ্ছে। এই জেলার কৃষকরা সবজির দামও ভালো পাচ্ছেন।

মাহমুদ.