হুন্ডি বেড়ে যাওয়ায় ধারবাহিকভাবে কমছে রেমিট্যান্স। তাই ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে ও হুন্ডি প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোকে ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
বৈঠকে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ব্যাংকার্স সভায় গভর্নর ছাড়াও ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও এসএম মনিরুজ্জামান এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) উপস্থিত ছিলেন।
এসকে সুর চৌধুরী বলেন, বর্তমানে বাজারে নগদ ডলারের সংকট রয়েছে। তা মেটাতে ডলার আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। এ জন্য আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার নির্দেশনার পরও ভালো গ্রাহকদের সুদে রিবেট বা ছাড় দিতে অনীহা দেখাচ্ছে বেশিরভাগ ব্যাংক। ২০১৫ সালের মার্চে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের সুদহারে বিশেষ ছাড়ের নির্দেশনা পরিপালন করেছে মাত্র ৬টি ব্যাংক। ১৬টি ব্যাংক এ সুবিধার জন্য মুনাফা থেকে একটি অংশ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছে। বাকি ৩৪টি ব্যাংক সুবিধা দেবে কি-না তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দর কষাকষি করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ১০ শতাংশ সুদ কমানোর যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই পালন করতে হবে। তা না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সভায় চলতি ও নতুন মুদ্রানীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণের সার্ভিস চার্জ, হলমার্ক গ্রুপের অনুকূলে সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃত বিল, ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা ও আগের ব্যাংকার্স সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, নির্দেশনার আলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সব ব্যাংককে এ সুবিধা দিতে হবে। সুবিধা না দেয়ার সুযোগ কোনো ব্যাংকের নেই। মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসমই) ঋণের সার্ভিস চার্জ ১৪ থেকে নামিয়ে ৬টি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। যা ব্যাংকগুলোকে পরিপালন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুদ হারে রিবেট দেয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিল তা মাত্র কয়েকটি ব্যাংক দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোকে রিবেট দেয়ার জন্য তাগাদা দেয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্পের ঋণের প্রায় ১৪ ধরনের চার্জ আদায় করছে ব্যাংকগুলো। লোন অ্যাপ্লিকেশন ফি, লোন প্রসেসিং ফি, ডকুমেন্টেশন ফি, সার্ভিস চার্জ, লিগ্যাল ফি, এপ্রাইসাল ফি, সার্ভে ফি, মর্টগেজ ফি, আর্লি সেটেলমেন্ট ফি, ব্যাংক গ্যারান্টি, মনিটরিং ফি, রিনিউয়াল ফি ইত্যাদি নামে চার্জ আদায় করে।
এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে কোনো কোনো ব্যাংক। এতে ঋণের কার্যকর সুদ হার ৪ থেকে ৬ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। তাই সার্ভিস চার্জ আদায়ের ৬টি খাত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
আমানত ও ঋণের সুদ হারের ব্যবধান স্প্রেড যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমানতের বিপরীতে যে পরিমাণে সুদ হার কমেছে ঋণের বিপরীতে সেই হারে কমেনি। এতে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতরা উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গ্রাহক ঠকানো এই কৌশল বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বৈঠকে হলমার্ক জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকগুলো সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃত বিলের বিপরীতে গ্রাহকের অনুকুলে সৃষ্ট ফোর্সড লোনের বিপরীতে সুদ আদায় করবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া যেসব ব্যাংক পাওনা আদায়ে মামলা করেছিল ওই সব মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে।
জানা গেছে, দেশের উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলা ও ভালো ঋণগ্রহীতাদের নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। গত ২০১৫ সালে আদায়কৃত সুদের উপর ১০ শতাংশ রিবেট দেয়ার বিধান জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু মাত্র ৬টি ব্যাংক ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা রিবেট দিয়েছে এবং ১৬টি ব্যাংক রিবেট দেয়ার জন্য ৫৭ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে। বাকি ৩৪টি ব্যাংক এখনও রিবেট দেয়ার কোন উদ্যোগ নেয়নি। ভালো গ্রাহকদের রিবেট দিতে ব্যাংকার্স সভায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এছাড়াও সদ্য সমাপ্ত ২০১৬ সালে রেমিট্যান্স কমেছে ১৭০ কোটি ৬১ লাখ মার্কিন ডলার বা ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। টাকার অংকে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা।
এমএনজে





