দুর্নীতির অভিযোগে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য সুপরিশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ওই সুপরিশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান।
এর কয়েকদিন আগে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে সরকারি মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত রবিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠি দিয়ে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানায়।
জানা গেছে, সাধারণ আমানতের পাশাপাশি বেসিক ব্যাংকের সিংহভাগ আমানত জোগানদানকারী সরকারের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এ ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো-মন্দ হওয়ার সঙ্গে সরকারের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বেসরকারি খাতকে ঋণ দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এসব ঋণের বড় অংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম।
বেসিক বাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জুনভিত্তিক ব্যাংকের ১২ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৯৪০ কোটি টাকা সাধারণ গ্রাহকের আমানত। ২৯১ কোটি টাকা আন্তঃব্যাংক আমানত। ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত হচ্ছে সাত হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। বাকি ২৪০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে নেয়া এফডিআর ও অন্যান্য দায়।
আবার ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অর্থই হচ্ছে সাত হাজার ৩১৪ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের অর্থ মাত্র ১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরাসরি সরকারের আমানতও আছে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাত্ সরকার নিজে ও সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৭৬ শতাংশ আমানতে বেসিক ব্যাংক চলছে।
জানা গেছে, সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রে একটা অনুপাত আছে। ৭৫ ভাগ আমানত রাখতে হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকে। এত দিন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালীর চেয়ে বেসিক ব্যাংক ভালো ছিল বলে এখানেই বেশি আমানত রাখা হতো। কিন্ত এখন এ ব্যাংকটিই বড় সঙ্কটে।
গত কয়েক বছরে ব্যাংকটির পর্ষদ ও শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা মিলে গুরুতর অনিয়ম করে, জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় অর্থমন্ত্রীর কাছে বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে জানিয়েছে, পর্ষদের ১১টি সভায় ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যার অধিকাংশই গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে করা হয়েছে। বেসিক ব্যাংকে অনিয়মই হয়ে উঠেছে নিয়ম। সম্প্রতি এ ব্যাংকের অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তকৃতদের বিরুদ্ধে ঋণসংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়।
বেসিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ঋণ কমিটি নেতিবাচক মত দেয়ার পরও পর্ষদ কোটি কোটি টাকার অনিয়মের ঋণ অনুমোদন করেছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ৪০টি দেশীয় তফসিলি ব্যাংকের কোনোটির ক্ষেত্রেই পর্ষদ কর্তৃক এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না। ঋণের অর্থ পরিশোধিত হবে না জেনেও ঋণ প্রদান করা হচ্ছে এবং এ ধরনের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে পর্ষদ কর্তৃক আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংকের বরখাস্তকৃত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোনায়েম খান ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ আলীসহ পাঁচজনের নামে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়ার ২৫ মে প্রত্যেকের নামে নোটিশ জারি করা হয়।
এসব নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে অর্থনীতিবিদরা  আমানতকারীদের স্বার্থে আর দেরি না করে এখনি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করে আসছেন। এরই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দুর্নীতির অভিযোগে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য সুপরিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
[b]ঢাকা, ২৯ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]