আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমেছে, কিন্তু বাংলাদেশে চিত্র উল্টো। ঢাকার বাজারে এক মাস ধরে বাড়তে বাড়তে খোলা চিনির দাম এখন ৭৮-৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, যা সাম্প্রতিক কালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক মাসে চিনির দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ। আর এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরবরাহ পর্যায়ে কারসাজি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চিনির দাম বাড়তে শুরু করে এক মাস আগে থেকে। রাজধানীর বড় বড় বাজার ঘুরে টিসিবির তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী, এক মাস আগে বাজারে চিনির দর ছিল ৬২-৬৫ টাকা। এখনকার দর ৭৪-৭৬ টাকা।
ফলে এক মাসে গড়ে দাম বেড়েছে সাড়ে ১১ টাকা। রমজান মাস ঘিরে প্রায় আড়াই লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয়। এ সময় ক্রেতাকে চিনির দাম গড়ে ৮ টাকা বেশি দিতে হলে তাদের পকেট থেকে বেরিয়ে যাবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের খুচরা দোকানে অবশ্য প্রতি কেজি খোলা চিনি ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ বাজারটিসহ ঢাকার যে গুটিকয়েক বাজারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি আছে, সেখানে ৭৫-৭৬ টাকা দরেই চিনি মিলছে।
কিন্তু ছোট বাজার ও বাসার কাছের মুদি দোকান থেকে ক্রেতাকে পণ্যটি কিনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭৮-৮০ টাকা দরে। প্যাকেটজাত চিনি ৭০ থেকে ৭৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। অবশ্য তা সব জায়গায় মিলছে না।
চিনির এ মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ ছিল না। ইন্টারন্যাশনাল সুগার অর্গানাইজেশনের (আইএসও) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে সাদা চিনির টনপ্রতি দর ৫৩০ ডলারের বেশি ছিল। সর্বশেষ ২৬ মে সেই দর ৪৩২ ডলারে নেমেছে।
অন্যদিকে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে এসেছে ১৭ লাখ টন চিনি, যা মোট চাহিদার চেয়েও ৩ লাখ টন বেশি।
এপ্রিল মাসে পাইকারি বাজারে চিনির বস্তা (৫০ কেজি) ছিল ২ হাজার ৯০০ টাকা। ওই মাসের শেষ দিকে শীর্ষস্থানীয় চিনি উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপের চিনির মিল সংস্কারের জন্য সপ্তাহখানেক বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাজধানীর মৌলভীবাজারে যখন চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ার আভাস পাওয়া যায়, তখনই সরবরাহ আদেশ (এসও) হাতবদল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এবার যখন মেঘনা গ্রুপের মিল বন্ধ হয়ে বাজারে সরবরাহে টান পড়ল, তখনই পাইকারি বাজারে দাম বাড়তে শুরু করল। একই ঘটনা ঘটেছিল গত বছর রোজার আগে। তখন প্রথমে মেঘনা গ্রুপের মিল বন্ধ হয়। পরে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয় সিটি গ্রুপের চিনিকল।
ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তিন-চারটি পরিশোধনকারী।
এদের মধ্যে যোগসাজশ আছে। তারা প্রতিবছর রোজা এলেই সংস্কারের নামে একটি-দুটি মিল বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। পাশাপাশি সরবরাহ ধীরগতির করে মিলগেটে দীর্ঘ লাইন করে। এ কারণেই এখন চিনির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
বড় মিলগুলো এখন দাবি করছে, তারা ৫৮-৫৯ টাকা দরে মিলগেটে চিনি বিক্রি করছে। কিন্তু মৌলভীবাজারের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিলের সরবরাহ আদেশে (এসও) চিনির দর ৫৯ টাকাই। তবে সেই চিনি মিলবে অনেক পরে। কিন্তু চিনি দরকার এখনই।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের মতো এ বছরও কৌশলে চিনির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন বড় বড় পরিবেশক মিলমালিকদের সঙ্গে মিলে এ কারসাজি করেছেন।
কারওয়ান বাজারের খুচরা দোকানগুলোতে বাজারদরের যে তালিকা টাঙানো, তা দেখলে চিনির এ চড়া দর টের পাওয়া যাবে না। ওই বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের তালিকায় চিনির দাম লেখা কেজিপ্রতি ৭০-৭২ টাকা। আর চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) প্যাকেটজাত চিনির দর লেখা ৬৫-৬৬ টাকা।
কিন্তু দোকানে কোনো চিনিই খুঁজে পাওয়া গেল না। জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, যে দাম লেখা, তার চেয়ে কেনা দর বেশি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয়ে তিনি দাম কমিয়ে লিখেছেন। কিন্তু এত কম দামে বিক্রি সম্ভব নয়, তাই দোকানে চিনি ওঠাননি।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারভেদে তাঁদের এখন এক বস্তা (৫০ কেজি) চিনি কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা দরে। এতে পাইকারি দরই পড়ে কেজিপ্রতি ৭২-৭৪ টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচ, ঘাটতি ও লাভ যোগ করার পর কেজিপ্রতি ৭৮ থেকে ৮০ টাকার কমে বিক্রি করা কঠিন।
রোজা শুরুর পর সিটি গ্রুপ ঢাকার ১০টি এলাকায় খুচরা ক্রেতাদের কাছে ৬০ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি করছে। টিসিবি ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করছে দেশি চিনি। এস আলম গ্রুপ চট্টগ্রামে ৫৯ টাকা দরে চিনি বিক্রি করছে। কিন্তু সাধারণ বাজারে এসবের কোনো প্রভাব পড়ছে না।
শীর্ষস্থানীয় চিনি উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (বিপণন) আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমরা পর্যাপ্ত সরবরাহ দিচ্ছি। এমনকি যখন আমাদের মিল সংস্কারের জন্য বন্ধ ছিল, তখনো ১৩ হাজার টন আগাম উৎপাদন করে বাজারে ছেড়েছি। এখন দিনে ২ হাজার টনের বেশি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বাজারে ঘাটতি থাকার কথা নয়।’
গোলাম রহমান বলেন, ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন করা হয়েছিল। সেই আইনের অধীনে একটি প্রতিযোগিতা কমিশনও করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। কমিশনের উচিত চিনি সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কারসাজি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া। একবার ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ কারসাজি আর হবে না। (সূত্র:প্রথম আলো)
জেড





