রাজধানীতে ঈদ কেনা-কাটায় ফুটপাতমুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। জমে উঠেছে ঈদ বাণিজ্য। ধনী-গরিব সবাই এখন ঈদের কেনাকাটায় মহাব্যস্ত। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় করে কেনাকাটা চলছে।
বিক্রেতার হাঁকডাকে চারপাশ সরগরম। একটানা সুরে-ছন্দে হাঁকডাক চলছে 'বাইছ্যা লন একশ', দেইখ্যা লন একশ।' ‘দেইখ্যা লন তিনশ’, ‘বাইছ্যা লন তিনশ’, ‘একদাম তিনশ’, ‘যেটাই নেবেন তিনশ’, আগে আসলে আগে পাবেন তিনশ’, ঈদ সামনে রেখে এভাবেই জমজমাট ফুটপাতের ঈদ বাজার। আর এমন যুগল ধ্বনি শোনার জন্য বেশিদূরে যেতে হয় না।
রাজধানীর গুলিস্তান, বায়তুল মোকারম, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মালিবাগ, মিরপুর ১ নম্বরসহ বিভিন্ন জায়গার পুটপাতে বসে চিৎকার করে বিক্রেতারা এভাবেই তাদের পণ্যগুলো বিক্রি করছেন। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের চাহিদার সব পণ্যই কম দামে পাওয়া যায় বলে ফুটপাথে এসব জিনিসের চাহিদাও অনেক বেশি। আর এসব নিম্ন আয়ের মানুষের কেনাকাটার জন্য জনপ্রিয় বাজারও হলো ফুটপাত।
ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই মুখরিত হয়ে উঠছে রাজধানীর মার্কেটগুলোর ঈদ-কেনাকাটায়। ঢাকার অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাত এখন ক্রেতার দখলে। অনেক রাত পর্যন্ত চলেছে বিকিকিনি। ব্যবসায়ীদের মতে, ঈদে মধ্যবিত্ত শ্রেণীই বেশি কেনাকাটা করে থাকে। অধিকাংশ চাকরিজীবী বেতন-বোনাস পাওয়ায় তারাও কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন।
সাধারণত নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষরাই ফুটপাতের বাজারের মূল ক্রেতা। তবে মধ্যবিত্তরাও একটু কম দামে পছন্দের পণ্যটি কিনতে ফুটপাত চষে বেড়াচ্ছেন। কেননা বড় বড় মার্কেটে পোশাকসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক দ্রব্যের দাম বেশি থাকায় দাম বাড়ায় অনেকেই তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফুটপাথ থেকে পছন্দের পোশাকটি বেছে নিচ্ছেন।
বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশের ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের ঢল নেমেছে। পাঞ্জাবি, শার্ট, লুঙ্গি থেকে শুরু করে নানা ধরনের তৈজসপত্রের কেনাকাটায় সরগরম পুরো এলাকা। ফুটপাতে পাঞ্জাবি বিক্রেতা আজিজ উদ্দিন বলেন, আগামী শুক্রবার থেকে চাঁদরাত পর্যন্ত ফুটপাতে বিক্রি সবচেয়ে বেশি হবে। নিম্ন আয়ের মানুষগুলো শেষ পর্যায়ে তাদের পছন্দের পোশাকটি কিনে থাকেন বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৫টি ফুটপাত বাজার বসে। এসব বাজারে নতুন নতুন পোশাকের পাশাপাশি রয়েছে নান পণ্য। দেখা গেছে, গাউছিয়া মার্কেট, হকার্স মার্কেট, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ গেট, মতিঝিলের ফুটপাতের দোকানগুলোতে দেখা যায়, কেউ কেউ এক দামে আবার কেউবা দর কষাকষিতে পণ্য বিক্রি করছেন।
ফুটপাতের বহু ব্যবসায়ী জানান, এবার ঈদের কেনাকাটা বেশ মন্দা। গাউসিয়ার সামনের ফুটপাতে থ্রিপিস ব্যবসায়ী জাহিদুল বলেন, এবার বিক্রি এতই খারাপ যে, মহাজনের দেনা শোধ করতে পারব না। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের হাতে অন্যান্য বছরের চেয়ে টাকা-পয়সা অনেক কম।
তবে ফুটপাতে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতারা অভিযোগ করে জানান, এবার তুলনামূলকভাবে ফুটপাতের বাজারগুলোতে পোশাকের দাম অনেক বেশি। অনেকেরই এসব পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই। তাই যারা দুটি জামা কেনার চিন্তা করেছিলেন, তারা একটি কিনেছেন। দামের কারণে বাজেটই ফেল হয়ে গেছে।
মালিবাগের ফুটপাতে ঈদের শার্ট কিনতে আসা শাহিন নামের এক ক্রেতা বলেন, বিলাসবহুল মার্কেট থেকে কেনার ইচ্ছে থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় কিনতে পারি না। তাই ফুটপাতে এসে ঘুরেফিরে বাজেটের মধ্যে প্রিয় পোশাকটি কিনতে চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, ফুটপাতে এসেও হতাশ হয়েছি। পনেরো দিন আগে যেসব পোশাক দেড় থেকে দুইশ’ টাকায় পাওয়া যেত সেটা এখন আড়াই থেকে তিনশ’ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
ফুটপাতের কেনাকাটায় পুরুষদের পাশাপাশি নারী ক্রেতাদেরও দেখা যায় স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে কেনাকাটা করতে। এ কারণে ঈদের এ সময়টাতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে ছুটে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা দোকান সাজিয়ে কেনাবেচা করেন পাড়া মহল্লার টং দোকান বা রাস্তার পাশের উঁচু জায়গায়। পুঁজি কম থাকায় এরা কোথাও স্থায়ী দোকান করেন না। এসব দোকানে পাঞ্জাবি, পায়জামা, লুঙ্গি, শাড়ি, ছেলেদের শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, টি শার্ট, জুতা, ছোটদের পোশাক বেশি বিক্রি হয়। বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত ছাড়াও ওভারব্রিজের ওপরেও চলছে ঈদের কেনাকাটা।
এসব ফুটপাতের মার্কেটে পাঞ্জাবি ১০০ থেকে ৫০০ টাকা, ফুলহাতা শার্ট ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, হাফহাতা শার্ট ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, ছেলেদের জিন্সপ্যান্ট ৩৫০ থেকে এক হাজার টাকা, টি-শার্ট ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, ছোট ছেলেমেয়েদের পোশাক ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, মেয়েদের হিল ১৬০ থেকে ২৫০ টাকা, চামড়ার জুতা ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ছেলেদের বেল্ট ১২০ থেকে ৩০০ টাকা, চশমা ১৫০ থেকে ২২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের ফুটপাতে দেড়শ’ টাকা করে জুতা বিক্রেতা ও মৌসুমি হকার সিরাজ বলেন, জুতার দাম মাত্র ১৫০ টাকা হওয়ায় ঈদ উপলক্ষে আমাদের জুতাই বিক্রি বেশি হচ্ছে। নানা রকমের ক্রেতা আসেন আমাদের কাছে। গরিব-বড় লোক সবাই আমাদের কাছ থেকে জুতা কেনেন। গরিবরা কেনেন টাকা নেই দেখে। আর বড় লোকেরা জামার সঙ্গে মিলিয়ে ১০/১২ জোড়া জুতা একসঙ্গে কেনেন।
শুধু তাই নয়, সস্তায় শাড়িও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ফুটপাতে। এসব শাড়ি কিনতে পারবেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। জামা-জুতার পরে নারীদের প্রয়োজন অলঙ্কারের। ইমিটেশন, মেটাল, সিলভার নানা ধরনের ধাতব দ্রব্যের অলঙ্কারের দেখা মিলবে ফুটপাতের দোকানগুলোতে। এসব দোকানে ২০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার অলঙ্কার পাওয়া যায়।
ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ঈদের ছুটি কয়েকদিন আগে শুরু হবে বলে একটু আগেভাগেই জমে উঠেছে ফুটপাতের ঈদ-বাজার। দরিদ্রদের পাশাপাশি নিম্নমধ্যবিত্তরাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনার জন্য এখন ফুটপাতমুখী হয়েছেন।
ঈদুল ফিতরের উৎসবের সঙ্গে নতুন পোশাকের সংযোগ নিবিড়। ঈদে যে শুধু জামা-জুতা-প্রসাধনীর মার্কেটই জমে উঠেছে তা নয়। গত কয়েক বছরের মতো এবার ঈদেও কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাদের আগ্রহের কমতি নেই। এ ছাড়া রয়েছে আসবাব ও রান্নাঘরের টুকিটাকি।
এবারও তরুণীদের আলোচিত ফ্যাশন যথারীতি বলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র আর ভারতীয় জনপ্রিয় সিরিয়ালগুলোর নায়িকাদের নামেই। ঈদ-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ডিসকো চোলি, আঙ্গারা, ফুলকি, খুশি, রাসি, কোয়েল, চিকনি চামেলি এবারের হিট ও আলোচিত ফ্যাশন। ফ্যাশন ডিজাইনার সানজিদ বলেন, এবার রঙ-নকশায় বর্ষা প্রাধান্য পেয়েছে। ঈদ-বাজার মাত করে 'হিমু পাঞ্জাবি' এখন তরুণদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।
ফ্যাশনপ্রিয় লোকজন ছুটে গজ কাপড় কেনার পর ক্রেতারা ছুটছেন সুই-সুতা, লেইস-ফিতা, বোতাম, পুঁতি-পাথর আর ব্লক-বাটিকের দোকানগুলোতে। দর্জির দোকানগুলোতে বিভিন্ন বয়সী নারীর উপচেপড়া ভিড়।
ফুটপাত বলে পণ্যের মান খারাপ, তা কিন্ত নয়। একটু দেখে-শুনে দরদাম করে কিনতে পারলে ভালো মানের পণ্য পাওয়া যায় ফুটপাতের দোকানগুলোতে। ফুটপাতে ভাসমান দোকান হওয়ায় দোকানের ভাড়া অল্প বলে পণ্যের দাম হয় কম। তবে ফুটপাতে পণ্য কিনতে হলে দরদাম করে কিনতে হবে। কারণ দোকানিরা অনেক সময়ই পণ্যের দাম চান বহুগুণ বেশি।
গুলিস্তানের ফুটপাতের দোকানি জব্বার হোসেন পাঞ্জাবি দেখাচ্ছিলেন ক্রেতাদের, মলিন দেখালেও পাঞ্জাবিগুলো কিন্ত নতুন। পাঞ্জাবিগুলোতে কোথাও একটু কাটাকুটি আছে কিংবা বোতাম নেই একটি দুটি অথবা কোথাও দাগ আছে একটু। সম্ভবত এখানেই এবার সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাবে ঈদের পাঞ্জাবি। আনকোরা কিনতে চাইলে দামের অঙ্ক বাড়বে। খরচ হবে নূ্ন্যতম ৩০০ টাকা।
ঈদের পোশাকের জন্য ফুটপাতের এসব পসরাই নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষের ভরসা। তারপরও ঈদে কিনতে হবে নতুন পোশাক। ফুটপাতে কেনাকাটা করতে এসেও অনেকে হিমশিম খাচ্ছেন বাজেট নিয়ে। অনেকে নিজের জন্য কিছু না কিনে শুধু প্রিয়জনকে খুশি করার জন্য সাধ্যমতো কেনাকাটা করছেন।
ঢাকা, এমআর, ২৩ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম





