রাজধানীর বিজয় সরণি থেকে তেজগাঁও যাওয়ার ওভারপাসের নিচের রেললাইনের পাশে নাসরিন বেগমের পিঠার দোকান। মাটির চুলায় কাঠ পুড়িয়ে পিঠা তৈরি করে তিনি বিক্রি করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সেই চুলায় চলছিল ভাত রান্না।

জানতে চাইলে নাসরিন বেগম বলেন, যে চাল হাঁড়িতে তিনি চড়িয়েছেন, তা সকালে ৬০ টাকা কেজি দরে বাজার থেকে কিনেছেন। বছরখানেক আগে এ চালই তিনি কেজিপ্রতি ৪০ টাকার নিচে কিনতেন। একটি শিশুসহ চার সদস্যের পরিবারে তাঁদের দিনে এক কেজি চাল লাগে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে চালের দাম বাবদ তাঁর পরিবারের মাসিক খরচ বেড়েছে ৬০০ টাকা।

চাল, আটার দাম বেড়ে যাওয়ায় নাসরিন বেগমের মতো রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষেরা কষ্টে আছে। এর প্রভাবও বহুমাত্রিক। রিকশাচালকেরা এখন বেশি ভাড়া চাইছেন, হোটেলগুলোতে ভাতের দাম বেড়েছে, খণ্ডকালীন গৃহকর্মীরা বেশি বেতন দাবি করছেন, শ্রমিকদের আয়ে পোষাচ্ছে না। সব মিলিয়ে প্রভাব পড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ে। মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে, জুলাইতে মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ঈদুল আজহার পরে। সঙ্গে কেজিপ্রতি ৪ টাকা বেড়েছে খোলা আটার দামও। এ ছাড়া বাজারে এখন ব্যাপক চড়া সবজির দাম।

পেঁয়াজের ঝাঁজও বেশি। ডাল, ভোজ্যতেল, রসুন, লবণ ইত্যাদি পণ্যের দাম নতুন করে বাড়েনি। তবে আগে থেকেই বেশ চড়া, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে।

নাসরিন বেগমের দোকান থেকে সামান্য দূরেই একটি বাজার। বাজারটির ক্রেতারা ওই এলাকার একেবারেই নিম্ন আয়ের মানুষ। এ বাজারে কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেল, মোটা চালের সর্বনিম্ন দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা।

মাঝারি মানের বিভিন্ন চাল বিক্রি হচ্ছে মানভেদে কেজিপ্রতি ৫৬ থেকে ৬০ টাকা দরে। আর মিনিকেট চালের কেজি ৬৫ টাকা। সবজির মান একটু ভালো হলেই কেজি ৫০ টাকার ওপরে। এক আঁটি শাকের দাম ১৫ টাকা।

স্থানীয় দোকানমালিক মো. পলিন বলেন, মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকার মতো কমেছে। ভারতীয় মোটা চাল তিনি কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে কমার পরিমাণ বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক কম। এক বছর আগে এ চালের কেজিই ২৮ থেকে ৩০ টাকা ছিল বলে জানান ওই বিক্রেতা।

বাজারটির মুদি দোকানগুলোতে ছোট ছোট ঠোঙায় চিনি, গুঁড়া মসলা, ডাল, রসুন ইত্যাদি পণ্য রেখে দেওয়া। কখনো শিশুরা, কখনো তাদের অভিভাবকেরা ১০ টাকা পাশে রেখেই একেকটি ঠোঙা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। কোনো দর-কষাকষি নেই। বিক্রেতারা জানান, এসব দোকানের বেশির ভাগ ক্রেতাই কম পরিমাণে কেনেন। ফলে তাঁদের দামও দিতে হয় বেশি।

১৩০ গ্রাম চিনির দাম ১০ টাকা, এতে কেজি পড়ছে প্রায় ৭৭ টাকা। কিন্তু কারওয়ান বাজারের খুচরা দোকানে চিনির কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। জানতে চাইলে মো. পলিন বলেন, বেশি পরিমাণে কিনলে তিনিও কেজিপ্রতি ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। কম পরিমাণে বিক্রিতে ঘাটতি হয়, পলিথিনের দাম বাবদ খরচ হয়, ছোট প্যাকেট করতে শ্রম বেশি । তিনি বলেন, গরিব মানুষ কম পরিমাণে কেনে, তাই দাম বেশি পড়ে। এতে বিক্রেতার লাভ।

কম পরিমাণে কিনে লাভ কী, জানতে চাইলে এক রিকশাচালকের স্ত্রী রাহেলা খাতুন বলেন, দিনের বাজার করার জন্য ১০০ টাকা দিয়েছেন তাঁর স্বামী। এ দিয়ে ৩০ টাকায় আধা কেজি চাল কিনেছেন। ১০ টাকার পেঁয়াজ, ১০ টাকার রসুন ও ১৫ টাকায় আধা কেজি আলু কিনেছেন। মাছ, ডিম অথবা সবজি কেনার জন্য হাতে আছে ৩৫ টাকা। রাহেলা খাতুন বলেন, তিনি ২০ টাকা দিয়ে এক হালি ডিম ও ১৫ টাকার শাক কিনবেন। বাজারে ভাঙা ডিম ২০ টাকা হালিতে পাওয়া যায়। ভালো ডিমের হালি ৩০ টাকা।

শেওড়াপাড়ায় এখন যে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে তাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন মো. সাগর। কাজ করার ফাঁকে খাদ্য অধিদপ্তরের খোলাবাজারে বিক্রি কর্মসূচি বা ওএমএসের দোকানে ঢুঁ মেরে চালের মান দেখতে যান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজারে কোনো কিছুই এখন কেনা যায় না। কোনো তরকারিই কেজিপ্রতি ৫০ টাকার নিচে নেই। মজুরি বেড়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবাই বাড়তি মজুরি চায়। কিন্তু এখনো বাড়েনি। হোটেলে ভাত খেতে গেলে তিন থালায় ১৫ টাকা বেশি লাগে, মজুরি না বাড়লে চলবে না।

কাজীপাড়ার রিকশাচালক আহের আলীর বাড়ি ময়মনসিংহে। বছর দু-এক হলো পরিবারসহ ঢাকায় এসেছেন। তিন সন্তান পোশাক কারখানায় চাকরি করে। ২ হাজার ২০০ টাকা ভাড়ায় এক ঘরে ভাড়া থাকেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবকিছুর দামই বাড়ে। এ বছরের শুরুতে বাসাভাড়া ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দাম নাকি বাড়বে, এ কথা বলে এখন মালিক আবার ভাড়া বাড়াবেন বলছেন।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি চলছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে এতে আর বিপাকে নিম্ন আয়রে মানুষ।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় এখন বাজারে ১১টি পণ্যের দাম কম-বেশি বাড়তি। বিপরীতে কম মাএ ৪টি পণ্যেরে দাম।

এ এস