তেল-গ্যাস খাতের বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরন। গ্যাস উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠানও এটি। শুধু শেভরনের মাধ্যমেই দেশে গ্যাসের চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি সরবরাহ হয়। কিন্তু কয়েক মাস ধরেই ব্যবসায়ী মহলে প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে ব্যবসা সংকোচনের গুজব শুনা যাচ্ছে।
অবশেষে বৃহস্পতিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি তেলের দর পতনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সংকোচন করছে শেভরন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখানে সম্পত্তি বিক্রি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
তবে শেভরনের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সম্পদ বিক্রির কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি। আমরা শুধু এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, যদি আকর্ষণীয় প্রস্তাব পাওয়া যায় তাহলে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি আগের বছরের অক্টোবরে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এক হাজার কোটি ডলারের সম্পদ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া চলতি বছরের জুলাই মাসে শেভরন জানায়, ২০০১ সালের পর প্রথমবারের মতো কোম্পানিটি প্রান্তিকীয় লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। ক্রুড অয়েলের মূল্য হ্রাস ও পরিশোধনে আয় হ্রাস হওয়াই এ লোকসানের কারণ।
অন্যদিকে গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেভরন বাংলাদেশে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ বিক্রি করতে আগ্রহী। বিষয়টি এরই মধ্যে বাংলাদেশে বেশ আলোচিত প্রসঙ্গ।
ব্লুমবার্গ আরো জানায়, বিভিন্ন বিদেশী ক্রেতা বাংলাদেশে শেভরনের সম্পদ কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় ও চীনা তেল উৎপাদকরা এগিয়ে আছেন।
শেভরনের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও কনডেন্সেট করে থাকে।
বৃহস্পতিবার, শেভরন বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শেভরনের সম্পদ বিক্রির বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি, তবে এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা চলছে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশের তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ তদারকি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে শেভরন। সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে এরই মধ্যে একাধিক দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে সম্পদ বিক্রির ইচ্ছার কথাও জানিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে অর্ধেকের বেশি কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। এ অবস্থায় জ্বালানি খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরনের কার্যক্রমও বিশ্বব্যাপী সংকুচিত হবে, এমন আভাস আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এর প্রভাব দেখা গেছে বাংলাদেশেও। কর্মী সংখ্যাসহ কমে গেছে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ প্রবাহ।
১৯৯৪ সালে সরকারের সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (পিএসসি) পর ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলনে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশে মোট তিনটি ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্বে আছে শেভরন। সম্মিলিতভাবে এ তিনটি ব্লকে এক বছরের ব্যবধানে শেভরনের বিনিয়োগ (মূলধনি ও পরিচালন) কমেছে ১৯ শতাংশ। এ তিন ব্লকে ২০১৪ সালে শেভরনের মোট মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় ছিল ৪১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে। আর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এ হিসাবে দুই বছরে বাংলাদেশে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ২২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার।
জানা গেছে, সম্প্রতি কাজাখস্তানে প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শেভরন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায়। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ফলে সম্প্রসারণের কাজ শুরু করতে তারল্য সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ব্যবসা বিক্রির পরিকল্পনা করছে শেভরন।
সূত্র: রয়টার্স





