জ্বালানি তেলে দেয়া সরকারের ভর্তুকি নেমে এসেছে শূন্যের কোটায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রও বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় অর্থবছর শেষে ২,০০০ কোটি টাকা মুনাফা থাকবে তাদের।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। যদিও এর সুফল পাচ্ছেন না দেশের ভোক্তারা।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশে তা কম দামে বিক্রি করা হয় বলে এতদিন বলে আসছিল জ্বালানি বিভাগ। এ কারণেই জ্বালানিতে প্রতি বছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে।
গত চার বছরে সরকার বিপিসিকে ভর্তুকি দিয়েছে মোট ৩৩,৪৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছরে ঋণ ও ভর্তুকি বাবদ বিপিসিকে দেয়া হয় ৪,০০০ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৮,৫৫০ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৩,৫৮০ কোটি ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭,৩৫০ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছর থেকে কোনো ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে না।
বিপিসির চেয়ারম্যান এএম বদরুদ্দোজা বলেছেন, জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার ধারায় ফিরেছে এবং এখন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বর্তমান ধারায় স্থিতিশীল থাকলে বিপিসির আগের ঘাটতি কমিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন প্রকল্পেও হাত দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
গতকাল বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটেও বিপিসির মুনাফায় ফেরার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম বিপিসি মুনাফার ধারায় ফিরেছে। যদিও পেট্রোল, অকটেন ও জেট ফুয়েলে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মুনাফা করে আসছে বিপিসি।
আর প্রতি লিটার ডিজেলে ৭ টাকার মতো ভর্তুকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু মোট জ্বালানির ৫৮ শতাংশ ডিজেল হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারছিল না তারা। তবে এ বছর ডিজেলেও মুনাফা হচ্ছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলেও সবসময়ই এতটা কম থাকবে না। বছরের শেষের দিকে দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হবে। তাই এখনই দাম সমন্বয় করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, অ্যাডহক ভিত্তির পরিবর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। এটা হলে ভবিষ্যতে আর বিপিসিকে লোকসানের চক্রে পড়তে হবে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০১৪ সালের ‘জ্বালানি খাত ও বাংলাদেশ’ সংক্রান্ত এক গবেষণায় বলা হয়, সরকার গত মেয়াদে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতকন্দ্র নির্মাণে মনোযোগী হওয়ায় জ্বালানিতে ভর্তুকি বেড়ে যায়।
জ্বালানি খাতে বিশাল ভর্তুকির কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। ফলে সংকট মোকাবেলায় সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বর্ধিত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে।
বর্তমানে বিপিসির দায় প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বিপিসির অব্যবস্থাপনাকেই এজন্য দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিপিসির কেনাকাটা ও আয়-ব্যয়ে গরমিল রয়েছে। তাদের হিসাব-নিকাশও স্বচ্ছ নয়।
অতীতে কত লোকসান করেছে, কেন লোকসান করেছে, বর্তমানে কতটুকু মুনাফা হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
এদিকে, বিপিসির হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অর্থ বিভাগ। তাদের হিসাব ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও (আইএমএফ)। চলতি বছরের শুরুতে বিপিসির অপারেশন ও ফিন্যান্স-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল কমিটির এক বৈঠকে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, বিপিসির যখন লোকসান হয়েছে, তখন জনগণের অর্থে তাদের ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। জনগণের কাছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে তেল বিক্রি করায় বিপিসি এখন মুনাফা করছে। এ লাভের অংশীদার জনগণ। জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল গঠন করে সেখানে মুনাফার টাকা রাখলে ভবিষ্যতে তা জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা যাবে।
তিনি আরো বলেন, বিপিসি কত লাভ করছে, কীভাবে করছে, তার হিসাব কেউ জানে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে তাদের জবাবদিহিতা করার কথা থাকলেও তারা তা করছে না। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করে। কিন্তু সে হিসাবে এখানে কোনো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নেই। সরকার এ বিষয়ে নজর দিলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হবে।
বিপিসি সূত্রমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে বিপিসির লোকসান হয় ৯,৭৯৯ কোটি টাকা ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ১০,৫৫১ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ছয় দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০১২-১৩ অর্থবছরে লোকসান কমে দাঁড়ায় ৫,৫২৭ কোটি টাকায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান হয় ২,৪৮০ কোটি টাকা।
এসএইচ





