গত দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতে ৯টি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারী হয়েছে। এবং গত ৭ বছরে ঘটা ছয়টি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারীতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বড় এসব আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ। কিন্তু একটি কেলেঙ্কারীরও বিচার হয়নি।
আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুজন আয়োজিত “ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ এসব কথা বলেন।
গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর থেকেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে চলছে, যা দেশের উন্নয়নে অন্যতম বাধা। এ নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা ও উৎকণ্ঠা। নিকট অতীতে পুঁজিবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারীর সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে রিজার্ভ চুরির ঘটনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে তিনি বলেন, গত ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মধ্যে নিহিত রয়েছে আমাদের জনগণের ঘাম ও রক্ত। একই সঙ্গে আমরা জানি যে, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং রিজার্ভের অর্থ তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা লোপাট হওয়ার ঘটনা আমাদেরকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।
তিনি বলেন, আইন ও বিধিমালার তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ইচ্ছামতো ঋণ দেয়া হয়। এমনকি প্রধান কার্যালয়ের ঋন যাচাই কমিটির বিরোধিতা সত্ত্বেও পর্ষদ অনুমোদ দেয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ১১টি পর্ষদ সভায়ই ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়।
ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিনিয়োগ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত পড়ে থাকে। ব্যাংক গুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় করতে না পারা, কিংবা কাকে ঋন ওদয়া হবে তা নিয়ে সংকট তৈরি হওয়া। ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতি। ব্যাংকগুলোর কেবল লাভের পেছনে ছোটা। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ও মন্দ ঋণ, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। ব্যাংক গুলো আইটি সিস্টেম সুরক্ষিত না থাকা। মুলধন ঘাটতি, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। আমানত সংগ্রহে অসম প্রতিযোগিতা। ব্যবস্থাপনার সংকট, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। সরকারি এবং বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে পরিচাকেদের অযাচিত হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সিবিএ নেতাদের দৌরাত্ম্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত মূলত আমানত নির্ভর। বড় ধরনের অর্থায়নে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট থাকায় এখানে ঋণপ্রবাহ কম। আর যেটুকু ঋণ দেওয়া হয়, তার বড় অংশই নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কম এ খাতে। এসব কিছু বিবেচনায় ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল মনে করে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স। সম্প্রতি সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকির মধ্যে অন্যতম হলো ঋণ নিবিড়তা।
তিনি রাজনেতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগ সম্পর্কে বলেন, মহাজোট সরকার ২০০৯ সাল থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রী মালিকানাধীন ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে আসছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগ দেয়া হলে তাঁদের যোগ্যতা নিযে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়।
অনিয়ম দুর্নীতি রোধে অন্য দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার সুনির্দিষ্ট উদাহরণ নেই বাংলাদেশে। কিন্তু অন্য দেশে নজিরবিহীন শাস্তি দেয়ার উদাহরণ রয়েছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্টের নাসদাকের সাবেক চেয়ারম্যান বার্নার্ড মেডফের শেয়ারবাজারে আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে ১৫০ বছর জেল দেয় এবং ১৭০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।
অনিয়ম দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। তাই অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করে এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।
তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রী একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা বলেছেন। নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ কাউকে কমিশন প্রধানের দায়িত্ব দিলে এ থেকে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাপক সংস্কার দরকার। এর ব্যবস্থাপনা অদক্ষ। এ অবস্থায আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুন্ন রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহি, নজরদারি শক্তিশালী করা।
ইআর/এমবি





