কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজে চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতির আকার ও আর্থিক খাতের গভীরতা বেড়েছে। চলমান বৈশিক মন্দা ও সাম্পতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিশীল পরিস্থিতিতেও দেশের অথনৈতিক অগ্রগতি অর্জন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
রোববার মিরপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে নবনিযুক্ত সহকারী পরিচালকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের ২০১৩ ব্যাচের সমাপনী এবং ২০১৪ ব্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভর্নর এসব কথা বলেন।
আতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অভিযান আর্থিক গভীরতাকে দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। তিনি জানান, এই সময়ে ব্যাংকের সংখ্যা ৪৮টি থেকে বেড়ে ৫৬টি এবং ব্যাংক শাখার সংখ্যা ৬৮৮৬টি থেকে বেড়ে ৮৫৬০টি হয়েছে।
আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাব সংখ্যা ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৬ কোটি ১২ লক্ষ হয়েছে।
এর মধ্যে দশ টাকায় খোলা কৃষক ও হতদরিদ্রদের ১ কোটি ৩৩ লক্ষ হিসাব রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে সঞ্চয়ে পরিমাণ ১৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫,৯২,৪৮২ কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ ১১৬ শতাংশ বেড়ে ৪,৫৬,১০৫ কোটি টাকা হয়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মূলধন ১৪৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫০,৩২৯ কোটি টাকা।
আতিউর বলেন, আথিক গভীরতা বাড়ায় এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সময়োপযোগী মুদ্রানীতি, ঋণনীতি এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বান্ধব নীতি-পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে বৈরী পরিস্থিতিতেও অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। এই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে অর্জিত হয়েছে।
গড় রেমিট্যান্স আয় ৪৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৫ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় ৫১ শতাংশ বেড়ে গড়ে হয়েছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭৩ শতাংশ, গড় আয় হয়েছে ২২.৬ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান রিজার্ভ রেকর্ড ১৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং বাজারভিত্তিক তদারকির কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হারও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ চেইন বিঘ্রিত হওয়ায় গত বছরের শেষ দু’মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ডিসেম্বর শেষে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৭.৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ইতোমধ্যে ১০৪৪ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসএন্ডপি ও মুডি’স এর রেটিংয়ে চার বছর ধরে সন্তোষজনক ঋণমান ধরে রাখতে পেরেছে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন অগ্রগতির রোল মডেল।
গভর্নর জানান, কৃষি, এসএমই ও ব্যাংকিং খাত ভালো করার কারণেই দেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। গত অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৪,৪৬৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্যে লক্ষ্যমাত্রা ১৪,৫৯৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে এসএমই ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা ৭৪,১৮৭ কোটি টাকার বিপরীতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৬২,৪৭৩ কোটি টাকা। চলতি বছরে এসএমই ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকগুলো নিজেরাই গত বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৮,৭৫৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে।
দেশে একটি সুষ্ঠু অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যাংলাদেশ ব্যাংক নিজেকে একটি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাইজড প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে; ব্যাংকিং খাতকে ডিজিটাইজড করার পথেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। অনলাইন ব্যাংকিং, অনলাইন সিআইবি সেবা চালু হয়েছে।
বিশ্বমানের অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতি চালু হয়েছে। ব্যাংকে ই-কমার্স চালু করা হয়েছে। গ্রীন ব্যাংকিং ও সিএসআরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। গ্রাহকদের অধিক সেবা নিশ্চিত করতে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বিদেশ থেকে প্রেরিত ও দেশের ভেতরের রেমিট্যান্স বিতরণ সহজ করা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সুবিধা দিতে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন,  এতকিছুর পরেও আমাদের আত্মতুষ্টির কিছু নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকে নবনিযুক্ত সহকারী পরিচালকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স ২০১৩ এর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক আতাউর রহমান, ডেপুটি গভর্নর এস. কে. সুর চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
[b]ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এসএমআর[/b]