সময় এবং সভ্যতা বদলে দিয়েছে গাইবান্ধা জেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে। এ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পের সাথে জড়িত হাজারো মানুষের জীবন জীবিকা। এখন তারা চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে নিয়োজিত হচ্ছে অন্য পেশায়।
সম্প্রতি সরজমিনে জানা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গাইবান্ধা জেলার ২০টি ইউনিয়নের ৮শ পরিবারের প্রায় ১০ হাজার মানুষ মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত ছিল।
সংসারের কাজের ফাঁকে এদের প্রধান কাজ ছিল নিত্য নৈমত্তিক ব্যাবহারের জন্য মাটির কলসী, হাঁড়ি-পাতিল, শানকি, মালসা, বদনা, নান্দা (চাড়ি), পাতকুয়ো বা ইন্দারার রিং ইত্যাদি তৈরী করা।
তারা বানিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য মটকি, হাউদা, ধান সিদ্ধ করার পাত্র, গুড়ের ভাঁড় বা পাত্র, মাছ ধরার কুনো, শস্যবীজ সংরক্ষণের জন্য হাঁড়ি, হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা পার্বণের উপকরণ হিসেবে ঘট, দিয়া প্রভৃতি তৈরী করতো।
এছাড়াও নানা ধরনের পুতুলসহ খেলনা সামগ্রী ও ঘর সাজানোর অসংখ্য সৌখিন উপকরণ (শো’ পিস) তৈরী করতো। মাটির তৈরী এসব তৈজসপত্র ব্যবহার করতো সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষ।
এক সময় গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মৃতশিল্পের সাথে জড়িত কুমার সম্প্রদায়ের বসবাসের জন্য কুমারপাড়া গড়ে উঠেছিল। এখন কুমারপাড়া থাকলেও মৃৎশিল্পী বা কুমার নেই। সকলেই পেশা বদলাতে শুরু করেছে।
জেলার বিভিন্ন স্থানে যে ২৫/৩০টি পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত রয়েছে তাদের দিনকাল এখন আর আগের মত ভাল যায় না। কারণ, শিল্প ক্ষেত্রে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে এখানকার মৃতশিল্প বিলুপ্ত হতে শুরু করে। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠে কাঁসা, পিতল, এলুমিনিয়াম, প্লাষ্টিক, মেলামাইন এবং ইস্পাতের তৈরী বিভিন্ন সামগ্রীর উপর।
সম্প্রতি কথা হয় গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটী ইউনিয়নের কুমারপাড়ার শ্যামল চন্দ্র ও বাবু চন্দ্রের সাথে। তারা জানান, বংশানুক্রমে তারা এ পেশার সাথে জড়িত। তাদের ছেলেরাও এ কাজ করে যাচ্ছে।
তারা আরো জানান, তাদের স্ত্রীরাও হাঁড়ি পাতিল বানিয়ে থাকেন। কিন্তু, বর্ষা মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের কমপক্ষে ৩ মাস ঘরে বসে থাকতে হয়।
এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, আগে মাটি পেতে কোন অসুবিধা হতো না, এখন টাকা ছাড়া জমির মালিকরা আর মাটি দেয় না। নিজের শ্রম, টাকা দিয়ে কেনা মাটি দিয়ে যে সকল তৈজসপত্র বানানো হয়, সঠিক ভাবে যদি হিসেব করা যায়, তাহলে এ সব বিক্রি করে বিনিয়োগকৃত টাকা উঠানোর পর যে আয় হয় তা দিয়ে আর পেট চলে না।
একই কথা শোনালেন বোনারপাড়া এলাকার সুরেন চন্দ্র নামের এক মৃৎশিল্পী। তিনি জানান,এখন মাটির তৈজসপত্র বানাতে আগের তুলনায় ৩ গুণ খরচ বেশি পড়ে। বিক্রি করতেও ঝামেলা পোহাতে হয়। তাই তারা এখন তাদের চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছেড়ে, চাষবাসের কাজে নেমে পড়েছেন।
এমকে





