দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে সাড়ে ৯৫ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের দুর্বল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ মন্দায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ। ব্যাংকগুলো বিজ্ঞাপন দিয়েও ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। এতে চরম সঙ্কটের মুখে পড়েছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। গত অর্থবছর শেষে এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বছর দুয়েক আগে ব্যাংকে নগদ অর্থের হাহাকার ছিল। সে সময়ে ১৫-১৬ শতাংশ সুদেও আমানত সংগ্রহ করতে পারেনি অনেক ব্যাংক। টাকার অভাবে ব্যাংকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে অনেকে দ্বারস্থ হয়েছিল উচ্চ সুদের কলমানি মার্কেটে। অথচ এখন এই আমানত ব্যাংকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেননা অর্থ বিনিয়োগ না করেও আমানতকারীদের নির্ধারিত সুদ দিতে হচ্ছে। যা ব্যাংকের মুনাফায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, গত বিশ বছরের মধ্যে বর্তমানে বিনিয়োগের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা চলছে। বিনিয়োগের খাত না পেয়ে কোনোরকমে টিকে থাকতে ব্যাংকগুলো সরকারের ট্রেজারি বন্ডে টাকা খাটাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, দেড় বছর আগে দেশের ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার সঙ্কট ছিল ভয়াবহ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ’১৩ শেষে প্রয়োজনীয় তারল্য সংরক্ষণের পর ব্যাংকিং খাতে ৯৫ হাজার ৫৮০ কোটি ৭১ লাখ টাকার তারল্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে ৪১ হাজার ২০৭ কোটি ২১ লাখ, রাষ্ট্রীয় খাতের বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ১ হাজার ৬১১ কোটি ৯৪ লাখ, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে ৪৩ হাজার ৬৬৩ কোটি ৫৬ লাখ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ৯ হাজার ৯৮ কোটি ১ লাখ টাকার তারল্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় খাতের সোনালী ব্যাংকে ২০ হাজার ৯০ কোটি, জনতা ব্যাংকে ১১ হাজার ৬২ কোটি ৬২ লাখ, অগ্রণী ব্যাংকে ৯ হাজার ৪১ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকে ১ হাজার ১৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকার তারল্য পড়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নভেম্বর ’১৩ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। যা এর আগের বছরের একই মাসে ছিল ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর মুদ্রানীতিতে এ মাসের প্রক্ষেপণ ছিল ১৬ শতাংশ।
ব্যাংকারদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। যাদের পূর্বে বিনিয়োগ রয়েছে তারাও সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছেন।
সোনালী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে ব্যাংকগুলো। কাঙ্ক্ষিত ঋণ বিতরণ না হওয়ায় অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর আমানত বেড়েছে ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। বিনিয়োগের চাহিদা না থাকায় বেশ কিছু দিন ধরেই ঋণ প্রবাহ কমছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এ সময়ে আমানত রয়েছে ৬ লাখ ২৭ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। এতে করে ঋণ আমানতের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর আগের বছর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০১৩ সালের জুন শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশে। তখন আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৭ অক্টোবর শেষে ব্যাংকগুলোর কাছে সামগ্রিকভাবে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫২২ কোটি টাকা নগদ রয়েছে। সে হিসাবে ব্যাংকিং খাতে মোট অর্থের ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশ তারল্য বা অলস। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৭৯ হাজার ৬৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে আড়াই মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে ১৫ হাজার ৯১৭ কোটি টাকার তারল্য বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ হারের ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহারের পর ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস্ বাংলাদেশ (এবিবি) চলতি মূলধন ও মেয়াদি আমানতের ওপর যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তবে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় ব্যাংকের কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। এতে মেয়াদি আমানতের ওপর বর্তমানে সাড়ে ১১ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র মতে, দেশে মোট বিনিয়োগের সিংহ ভাগ আসে ব্যাংকিং খাত থেকে। গ্রাহকের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে অলস টাকার পাহাড় জমা হয়েছে। তাই ব্যাংকগুলো আমানত নিরুত্সাহিত করতে সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। যদিও নতুন ব্যাংকগুলো টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে।
এছাড়া অন্যান্য ব্যাংক কিছুদিন আগেও যেখানে আমানতে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ গুনেছে, সেখানে বর্তমানে ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদি আমানতের (এফডিআর) নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেও গ্রাহকদের সুদ হার কমানোর নোটিস করা হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকগুলো সব সময় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে। কিন্তু ২০১৩ সাল জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে আশঙ্কাজনকভাবে বিনিয়োগ কমে গেছে। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যাংকের বড় বড় জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশের পর ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ায় এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ছয় মাসের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ মন্দায় ব্যাংকগুলোতে অধিক হারে তারল্য বেড়েছে। গত দু’বছর ধরে ব্যাংকিং খাতে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। উদ্যোক্তারা স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অস্থিরতার আশঙ্কা কাটেনি—যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি আরও বলেন, আমানতের সুদ হার কমলেও বিনিয়োগ মন্দায় ঋণের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে নতুন যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে তাদেরকে অধিক হারে সুদ গুনতে হবে। যা উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দিলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
[b]ঢাকা, ৬ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এসএমআর[/b]
অর্থনীতি
ঋণ বিতরণ স্থবির, সঙ্কটে বেসরকারি খাত
দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে সাড়ে ৯৫ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের দুর্বল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ মন্দায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ। ব্যাংকগুলো বিজ্ঞাপন দিয়েও ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। এতে চরম সঙ্কটের মুখে পড়েছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত।





