আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই শুরু হতে যাচ্ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র মাহে রমজান। এ নিয়ে বিশ্নের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের মুসলিমরাও প্রস্ততি নিতে শুরু করেছেন। প্রস্ততি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। তবে অন্যান্য দেশে রমজান মাসের সম্মানে যেখানে নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয়, সেখানে বাংলাদেশে এর চিত্র ব্যতিক্রম।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারো সরকারের দেয়া সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডেকেট রমজান মাসকে সামনে রেখে বাড়াতে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। অথচ কয়েক দিন আগেই জাতীয় বাজেটে এসব পণ্যের দাম কমানোর প্রস্তাব করা হলেও এর কোনো প্রভাব নেই রাজধানীর বাজারগুলোতে।

এছাড়া বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা ধরনের ঘোষণাও দিচ্ছে। এর মধ্যেই পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। ফলে রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।

এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি শুরু করলেও দাম স্থিতিশীল থাকছে না। রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে ছোলা, চিনি, সয়াবিন ও পাম তেল, মসুর ডাল, মটর ডাল, খেজুর ও মাংসের। এরই মধ্যে ছোলার দর কেজিপ্রতি ১০ টাকারও বেশি বেড়েছে। এ ছাড়া মসুর ডাল কেজিপ্রতি আট থেকে ১০ টাকা, মটর ডাল কেজি প্রতি পাঁচ টাকা বেড়েছে।

জাতীয় বাজেটে ভোজ্য তেলের দাম কমানোর প্রস্তাব করা হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। তবে খুচরা বাজারের চেয়ে রাজধানীর সুপার শপগুলোতে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি পাঁচ লিটার ১৫-২০ টাকা বেশিতে।

রোববার শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখানে ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬২ টাকায়, পাঁচ লিটারের রুপচাঁদা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৫৭৫ টাকায়। অথচ খুচরা বাজারে একই পরিমাণ ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায় এবং সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ টাকায়।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজান মাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে। চিনি, ছোলা ও মসুর ডালের দাম এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। তবে চালের বাজার এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল রয়েছে। পরিবর্তন হয়নি মসলার দামও। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৮ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, আদা ১৭০ থেকে ২০০ টাকা, রসুন ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, ছোলা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, মুগডাল ১০৫ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৮০ টাকা, চিকন মসুর ডাল ১১০ টাকা, চিনি ৪৮ টাকা, গরুর মাংস ২৮০ টাকা, খাসির মাংস ৪২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের দাম গত সপ্তাহেও কেজিপ্রতি তিন থেকে পাঁচ টাকা কম ছিল।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ ব্যবসায়ীর মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফা করার মানসিকতার কারণেই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে থাকেন। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরাই এটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

এদিকে রাজধানীর বাজারগুলোতে মসলার মধ্যে জিরার দাম বাড়লেও অন্যগুলোর দাম মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতিকেজি জিরা ৪০ টাকা বেড়ে ৩৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি শুকনা মরিচ ১৬০ টাকা, লবঙ্গ এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০, তেজপাতা ১৭০ থেকে ১৮০, এলাচ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০, দারুচিনি ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে রমজানের আগেই টিসিবি তিন হাজার টন তেল, দেড় হাজার টন ছোলা, ১৫০ টন খেজুর ও দুই থেকে তিন হাজার টন মসুর ডাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে কিছু পণ্য টিসিবি হাতে পেয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। টিসিবির নিজস্ব চারটি বিক্রয়কেন্দ্রসহ রাজধানীর প্রায় ৩৫ জায়গায় ট্রাকে করে এসব পণ্য বিক্রিও শুরু করে দিয়েছে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও টিসিবির খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে টিসিবির এসব কার্যক্রমে বাজার দর নিয়ন্ত্রণে কোনো লাভ হচ্ছে না।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর রমজান মাস এলেই শুধু উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর বাকি সময় আর কোনো উদ্যোগ না থাকায় এক মাসের জন্য এর কার্যকারিতা থাকে না।

এদিকে রাজধানীর কাঁচাবাজারে পণ্যের দাম উঠছে ব্যাপকহারে। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৬৫ টাকা, টমেটো ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা, পটোল ৩৫ টাকা, বেগুন ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কাঁকরোল ৩৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ টাকা, লতি ৩০ টাকা, বরবটি ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ২৫ টাকা, ঝিঙা ৩৫ টাকা, করোলা ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া প্রতিটি জালি ৩০ টাকা, লাউ ৪০ টাকা, প্রতি হালি কলা ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে ১০ জুন থেকে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। প্রতিবারের মতো এবারও নিত্যপণ্যের দাম জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সংস্থাটি এ কার্যক্রম শুরু করেছে। রমজান মাসে পণ্যের সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের দর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে এবার একটু আগে ভাগেই কাজ শুরু করার কথা বলছে টিসিবি।

এছাড়া রমজানের এক সপ্তাহ আগে খেজুর বিক্রি শুরু হবে। টিসিবির নিজস্ব ৪টি বিক্রয় কেন্দ্রসহ রাজধানীর প্রায় ৩৫টি স্থানে ট্রাকে করে এই বিক্রি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও টিসিবির খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম পরিচালিত হবে; কিন্তু টিসিবির কার্যক্রম খুবই সীমিত বলে ক্রেতারা অভিযোগ করছেন। ফলে ক্রেতারা আশঙ্কা করছেন এবারও বেশি দামে বাজার থেকেই পণ্য কিনতে হবে।

টিসিবি জানায়, এ বছর ৩ হাজার টন তেল, দেড় হাজার টন ছোলা, ১৫০ টন খেজুর ও ২ থেকে ৩ হাজার টন মসুর ডাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চিনি, ডাল ও তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও খেজুর ও ছোলা এখনও সংস্থাটির গুদামে এসে পৌঁছেনি। তবে সংস্থাটি আশা করছে ২০ জুনের মধ্যে পণ্য দুটি তাদের কাছে পৌঁছবে। আর এটি এলে রমজানের জন্য সব পণ্যের মজুদ থাকবে টিসিবির কাছে।

জানা গেছে, তানজানিয়া থেকে দেড় হাজার টন ছোলা আমদানি করা হয়েছে। আর আরব আমিরাত থেকে ১৫০ টন খেজুর আমদানি করা হচ্ছে, যা দুই-একদিনের মধ্যে এসে পৌঁছবে। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা হুমায়ন কবির টাইম নিউজ বিডিকে জানান, পণ্য বিক্রির কয়েক দিন আগে বাজারে বিক্রির দর নির্ধারণ করা হবে। তবে বাজার দরের চেয়ে টিসিবির পণ্যের দাম বেশ কম হবে বলে জানান তিনি।

সরকার রমজানে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছে। প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের দোকানের সামনে পণ্যের মূল্যতালিকা টাঙানোর নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ আদেশ না মানলে লাইসেন্স বাতিল ও পণ্য বাজেয়াপ্ত করার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

কিন্ত বাজারে এখনো এর কোনো নমুনা দেখা যায়নি। দু-একটি বাজারের দু-একটি দোকানে মূল্যতালিকা দেখা গেলেও পণ্যের দামের সঙ্গে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাদের কাছে টানতেই এমনটি করা হচ্ছে। মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলে ক্রেতারা দাম দেখে দূর থেকে চলে যায়। আর না টাঙানো থাকলে দাম চেয়ে কিছুটা কমিয়ে পণ্য বিক্রি করা যায়।

ঢাকা, ২২ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর//কেবি