ভয়াবহ কনটেইনার জটে মুখে চট্টগ্রাম বন্দরে বন্ধের পথে রফতানি বাণিজ্য। প্রতিষ্ঠার ১২৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ কনটেইনার জটের মুখে পড়েছে বন্দরটি। প্রায় বন্ধের পথে এখন রফতানি বাণিজ্য।

৩৬ হাজার ৩৫৭ টিইইউএস কনটেইনারের বিপরীতে গতকাল বৃহস্পতিবার বন্দরে কনটেইনার ছিল ৪০ হাজার ২৫৯ টিইইউএস। ১৬টি বেসরকারি ডিপোতেও ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে রফতানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার।

সেখানে বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে পণ্যবোঝাই চার হাজার ৭২০ টিইইউএস কনটেইনার। সব মিলিয়ে বন্দরে আটকা পড়েছে তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য।

গত চার দিন ধরে চলা প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে এই নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে এই ট্রেইলর মালিক-শ্রমিকদের সমর্থনে কাল শনিবার থেকে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতিও ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সমস্যা দ্রুত সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

ট্রেইলর মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সঙ্গে মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার বন্দর কর্তৃপক্ষ বৈঠক করলেও কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে সমস্যা সমাধানে নৌ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি হওয়া বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী কনটেইনারের ওজন ৩৩ টনের বেশি হলে দাউদকান্দি ও মেঘনা সেতুর সামনে বসানো ওজন স্কেল পার হওয়ার অনুমতি না দেওয়ায় গত রোববার রাতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

রফতানি পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়া অনুযায়ী, সারাদেশ থেকে কাভার্ডভ্যানে পণ্য এনে চট্টগ্রামের ১৬টি কনটেইনার ডিপোতে রাখা হয়। এরপর সেখানে রফতানি পণ্য কনটেইনারে বোঝাই করা হয়। পরে প্রাইমমুভার ট্রেইলর গাড়িতে করে বন্দর চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয় এসব কনটেইনার। সেখান থেকে কনটেইনার তুলে দেওয়া হয় জাহাজে।

কোরিয়ার জাহাজ কোম্পানি হ্যানজিনের দেউলিয়াত্বের ঘটনা দেশের রফতানিকারকদের ভুগিয়েছে ১৫ দিনেরও বেশি সময়। এটির রেশ কাটতে না কাটতে গত চার দিন ধরে চলছে প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘট। টানা এ ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ব্যবসায়ীরা কারখানায় নিতে পারছেন না আমদানি করা কাঁচামাল। আবার চট্টগ্রাম বন্দরে নির্ধারিত সময়ে পৗঁছানো যাচ্ছে না রফতানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার।
তাই রফতানি পণ্য রেখেই চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করছে একের পর এক বিদেশি জাহাজ।

গত চার দিনে ২০ ফুট দীর্ঘ দুই হাজার ৭০০ কনটেইনার রেখে ফিরে গেছে সাতটি জাহাজ।

আজ (শুক্রবার) সকালে চলে যাবে আরও তিনটি জাহাজ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে দেশের রফতানি বাণিজ্য।

আটকেপড়া রফতানি পণ্যের ৯৫ শতাংশই পোশাক শিল্পের। পোশাক খাতের মালিকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল হতে থাকবে রফতানিকারকদের বিক্রয় আদেশও। এরই মধ্যে শতাধিক রফতানিকারকের আর্থিক ক্ষতি ছাড়িয়ে গেছে হাজার কোটি টাকা।

রফতানিকারকরা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত ৬০০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয় বিদেশে। নির্দিষ্ট সময়ে বড় জাহাজ ধরতে না পারলে এয়ারে পাঠাতে হবে এসব পণ্য। এতে লোকসানে পড়তে হবে। আবার চুক্তি অনুযায়ী পণ্য পৌঁছাতে না পারলে অর্ডারও বাতিল করতে পারে বিদেশি ক্রেতারা।

গতকাল সকালে রফতানি কনটেইনার রেখে বন্দর ত্যাগ করে দুটি জাহাজ। 'ট্রিমলস ট্রেডার' জাহাজ ২৫৫ টিইইউএস ও 'এমভি হ্যারিজ' জাহাজ ১৮০ টিইইউএস রফতানি কনটেইনার রেখেই চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করেছে।

পর্যাপ্ত কনটেইনার না পাওয়ায় যাত্রা বিলম্বিত করেছে 'এমভি সাইগন ব্রিজ' জাহাজ। এক হাজার ২০০ টিইইউএস কনটেইনার নেওয়ার কথা থাকলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো কনটেইনার ওঠেনি এই জাহাজে।

'স্মাইলি লেডি' ও 'ম্যাজিস্টিক' নামের অপর দুটি জাহাজেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রফতানি কনটেইনার উঠেছে চাহিদার অর্ধেক। এর মধ্যে 'স্মাইলি লেডি'তে ৮০০ ও 'ম্যাজিস্টিক'-এ এক হাজার কনটেইনার যাওয়ার কথা ছিল।

গতকাল পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৩৫৭ ধারণ ক্ষমতার বিপরীতে বন্দরে বিভিন্ন ধরনের কনটেইনার ছিল ৪০ হাজার ২৫৯ টিইইউএস। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ৩১৬ টিইইউএস। পণ্য ডেলিভারির হার কমে যাওয়ায় এভাবে বাড়ছে কনটেইনার।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি মঈনুদ্দিন মিন্টু বলেন, 'রফতানি পণ্য নিয়ে একের পর এক বিপদ আসছে। হ্যানজিন কোম্পানির দেউলিয়াত্বের ঘটনা শতাধিক রফতানিকারককে ভুগিয়েছে ১৫ দিনেরও বেশি। এখন আবার শুরু হয়েছে প্রাইমমুভার ট্রেইলরের ধর্মঘট।

প্রায় ৫০০ রফতানি পণ্য বোঝাই কনটেইনার রেখে চলে গেছে তিনটি জাহাজ। শিগগির এ সমস্যার সমাধান না হলে ফিরে যাবে আরও অর্ধডজন জাহাজ।'

রফতানি পণ্য বিদেশি ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ফরোয়ার্ডারদের সংগঠন ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, 'বন্দর থেকে রফতানি পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো নেওয়া হবে সিঙ্গাপুর, পোর্ট কেলাং, তানজুং পেলেপাস ও কলম্বো বন্দরে। সেখানে অপেক্ষমাণ ইউরোপ-আমেরিকাগামী বড় জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। বন্দর থেকে নির্ধারিত জাহাজে তুলে দেওয়া না গেলে ওই চারটি বন্দরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজেও পণ্য পরিবহনের সময়সূচি রক্ষা করা যাবে না। এতে পুরো রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'

ধর্মঘট আহ্বানকারী সংগঠনের নেতা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃৃপক্ষের অনুরোধে তারা বৈঠকে বসেছিলেন। বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন অফডকে (কনটেইনার ডিপো) আটকেপড়া রফতানি পণ্য ভর্তি কিছু কনটেইনার বন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দাবি মানা না হলে এমন অনুরোধ আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।'

রফতানি পণ্য নিয়ে চলমান সংকট প্রসঙ্গে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর সংগঠন বিকডার সচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, 'রফতানি কনটেইনার পরিবহন করতে প্রাইমমুভার ট্রেইলরের বিকল্প নেই।' ফলে যেভাবেই হোক এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে।

এসএম