পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৯৪ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসাব করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা।
২০১৫ অর্থ-বছরে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের হিসাব থেকে এই রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স আয়ের চিত্র জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৯৪ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসী তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় থেকে ২০১৫ অর্থবছরে ১৫.৩১ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশী মূদ্রায় হিসাব করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যাবত এটাই সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আয়ের রেকর্ড।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোত শ্রমিক রপ্তানির পরিমাণ উদ্বেগজনকহারে হ্রাস পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালের তুলনায় বিদেশে শ্রমিক রপ্তানির হার ২০১৪ সালে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে, বিশ্ব অর্থনীতির শ্লথ গতির মধ্যেও নারী শ্রমিক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে কর্মরত সরকারী সংস্থা বিএমইটি (Bureau of Manpower , Employment and Training-BMET)-এর দেয়া ২০১৫’র জুন পরবর্তী এক জরিপে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা আবুধাবি বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিক রপ্তানির ক্ষেত্রে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে। বিএমইটির ওই জরিপ অনুযায়ী, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী মোট নারী অভিবাসীদের ২৭ শতাংশই শুধুমাত্র আবুধাবিতে কর্মরত রয়েছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশী নারী অভিবাসীদের আবুধাবিতে গমনের এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতার দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অন্য দেশের তুলনায় আবুধাবিতে নারীদের চাহিদা বেশি থাকা এবং দ্বিতীয়ত, অপরাপর দেশের তুলনায় আবুধাবিতে নারী শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেশি হওয়া।
আবুধাবির পর সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী নারী শ্রমিক রয়েছেন লেবাননে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদশী নারী অভিবাসীদের ২৪.৩ শতাংশই রয়েছেন শুধুমাত্র লেবাননে। যদিও সবমিলিয়ে দেশটিতে বিদেশে কর্মরত মোট বাংলাদেশী অভিবাসীদের মাত্র ১.৩ শতাংশ অবস্থান করছেন। সবশেষ জরিপ অনুযায়ী, লেবাননে প্রায় ৯৭ হাজার বাংলাদেশী নারী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।

তবে, নারী অভিবাসী তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সার্বিক হিসাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন সৌদি আরবে। মোট অভিবাসীদের ২৮.২ শতাংশই কাজ করছেন শুধুমাত্র সৌদিতে।
২০১৫ সালের জুন মাসের শেষে বিএমইটির দেয়া এক হিসাবে বলা হয়, বর্তমানে ২৬ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী সৌদিআরবে কর্মরত রয়েছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় হয়েছে ৩.১২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
সৌদি আরবের পর সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছেন আবুধাবিতে। বর্তমানে সেখানে ২৩ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। ২০১৪ সালে আবুধাবিতে কর্মরত অভিবাসীদের মাধ্যমে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় হয়েছে ২.৬৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।
সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক রাখার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ওমান। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে ১০.৭ শতাংশ রয়েছেন ওমানে। ২০১৫ সালের জুন শেষে এক জরিপে দেখা গেছে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক বর্তমানে ওমানে কাজ করছেন। আর ২০১৪ অর্থবছরে তাদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ০.৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬শ কোটি টাকা।

বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যানুপাতে এরপরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ৭ লাখ ১৪ হাজার এবং সিঙ্গাপুরে ৫ লাখ ৬ হাজার বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন।
এই দুই দেশে কর্মরত অভিবাসী বাংলাদেশীদের মাধ্যমে ২০১৪ অর্থবছরে রেমিটেন্স আয় হয়েছে যথাক্রমে ১.০৬ বিলিয়ন এবং ০.৪৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮ হাজার ৪৮০ কোটি এবং ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানে অবস্থানকারী কুয়েত ও কাতারে রয়েছে যথাক্রমে ৫.২ শতাংশ এবং ৪.৪ শতাংশ বাংলাদেশী অভিবাসী। ২০১৪ অর্থবছরে কুয়েতে অবস্থানকারী অভিবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১.১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
অপরদিকে, ২০১৪ অর্থবছরে কাতারে কর্মরত বাংলাদেশী অভিবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ০.২৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা।
২০১৫ সালের জুন মাস শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে কুয়েতে কর্মরত রয়েছেন ৪ লাখ ৯ হাজার বাংলাদেশী এবং কাতারে কর্মরত রয়েছেন ৪ লাখ ১ হাজার বাংলাদেশী অভিবাসী।
উল্লেখ্য, মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের রেখে বহুদূরে বিদেশের মাটিতে কর্মরত এসব শ্রমিকের তিলে তিলে কামানো অর্থ দিয়ে গড়ে ওঠা রেমিটেন্স আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। দারিদ্র বিমোচন থেকে শুরু করে বাজেট তৈরি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে এই রেমিটেন্স প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাই অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকার আরও যত্মবান হবেন এবং বিমানবন্দরে নাজেহাল করাসহ বিভিন্ন স্তরে অভিবাসীরা যেসব ভোগান্তির শিকার হন তা নিরসনে সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন-এটাই অভিবাসী শ্রমিকদের প্রত্যাশা।
কেবি





