কুষ্টিয়ার বেশিরভাগ তামাক কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। মালিকদের উদাসীনতার কারণে জেলার ছোট-বড় প্রায় ২ শতাধিক গোডাউনে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ যক্ষ্মা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, আলসারসহ বিভিন্ন জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছেন।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, পরিবেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি তোয়াক্কা করছে না এসব তামাক কারখানাগুলোর মালিকপক্ষ। নামমাত্র মজুরিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তামাক জাতীয় কাজ করছে অনেকেই।

কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় দুইশটি তামাক কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিএটিবি, নাসির টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের টোব্যাকো লিমিটেড, আকিজ গ্রুপের ঢাকা টোব্যাকো লিমিটেড, বিআরবি গ্রুপের পারফেক্ট টোব্যাকো, গ্লোব টোব্যাকো ইত্যাদি।

এছাড়াও নাসির বিড়ি, মুনছুর বিড়ি, মনমোহন বিড়িসহ বিভিন্ন কারখানায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে শত শত শ্রমিক।

এসব তামাক কারখানার কারণে একদিকে যেমন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদেরও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। কর্মরত এসব শ্রমিকদের শরীরে কোনো না কোনো তামাক জাতীয় রোগব্যাধি রয়েছে। প্রতিটি করাখানাতেই সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তামাক ক্রাসিং, গুল, খইনি, ভেজাপাতাসহ তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুত করে বাজারজাত করা হচ্ছে।

এসব কারখানায় শিশু, নারী-পুরুষ মিলে কর্মরত রয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক। এদের মধ্যে মহিলা ও শিশুরা কাজ করছে নামমাত্র মূল্যে। শুধু পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই যক্ষ্মা, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, তামাকের ক্ষতিকর উপাদান শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুস ফুসে গিয়ে জটিল রোগ হয়। যা মানব শরীরের জন্য ভয়াবহ।

শিল্প কারখানা আইনে ১০ জনের বেশি শ্রমিক কারখানায় কাজ করলে তিন মাস পর পর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও এসব কারখানা মালিকরা তা মানছেন না। এছাড়া তামাকনির্ভর শিল্প কারখানায় যেসব শ্রমিক কাজ করেন তাদের কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্য সম্মত আছে কিনা, সেটিও কখনো পরীক্ষা করে দেখা হয় না। এ ব্যাপারে তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য মীর আব্দুর রাজ্জাক জানান, কুষ্টিয়ায় তামাক কোম্পানিগুলো নিয়মনীতি মানছে না। তামাক কোম্পানিগুলোর কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, তামাক আবাদের ফলে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। তামাক আবাদ করতে গিয়ে শারিরীক ও মানসিক বিভিন্ন সমস্যায় ভূগছে চাষীরা। তামাকে অতিরিক্ত জ্বালানির ফলে কুষ্টিয়ায় গো-খাদ্যের চরম সঙ্কট দেখা দেয় ফলে বিপাকে পড়ে জেলার পশু খামারীরা।

কুষ্টিয়ার মিরপুরে তামাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক আলেয়া খাতুন জানান, সংসারের অভাবের কারণে তামাক কারখানায় কাজ করতে হয়। এ কাজে কোনো প্রকার অসুবিধা আছে কিনা, তা তারা জানে না।

তিনি জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলে ৫০ থেকে ৮০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। এ টাকা দিয়েই সংসার কোনোরকমে চালিয়ে নিতে হয় তাদের। তবে একটানা এ কাজ করে ইতোমধ্যে অনেকেই বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। এসব রোগ প্রতিরোধে শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে যেমন সচেতনতা বাড়ানো দরকার, তেমনি কারখানার মালিকদের ব্যাপারেও আইনি প্রয়োগ হওয়া দরকার।

এব্যাপারে অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, তামাকের কারণে ভয়ঙ্কর গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস দেখা দিতে পারে। মূলত তামাক প্রক্রিয়াকরণের সময় নিকোটিন চামড়ায় লেগে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক কিংকর চন্দ্র দাস বলেন, সিগারেট কোম্পানিগুলোর সহায়তার কারণে তামাক চাষে অল্প সময়ের মধ্যে কৃষক ভালো অর্থ পাচ্ছেন। তবে তামাক মাটি থেকে খুব বেশি পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়। ক্ষেতে প্রচুর সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় দীর্ঘমেয়াদে মাটির ক্ষতি হয়। বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের জানানো হচ্ছে।

ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের বাংলাদেশ প্রোগ্রামের তাঈফুর রহমান বলেন, যে হারে দেশে তামাকের চাহিদা বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি হারে চাষ বাড়ছে। যা আগামী দিনের কৃষি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তামাকের ক্ষেতে কয়েক বছর পর অন্য ফসলের চাষও হয় না।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডাঃ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, অতিরিক্ত তামাক চাষের ফলে শিশুসহ বয়োঃবৃদ্ধরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুরা নিমোনিয়া, ডায়রিয়া, হাঁপানি রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তামাক চাষ বন্ধ না হলে জেলায় জুড়ে ব্যাপকহারে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এমআইএস