লঘু নিয়ন্ত্রণাধীন ছায়া ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড অনেক বেড়ে এখন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ দখল করেছে। আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য তা একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ মন্তব্য করে।
বুধবার ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থাটির গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বিভাগের প্রধান গ্যাস্টন জেলোস বলেন, বিশ্বের ছায়া ব্যাংকগুলো এখন প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। অঙ্কটি অনেক বড়। এর ঝুঁকি নিরূপণ করতে হলে সেখানে কী হচ্ছে, তা বোঝা প্রয়োজন।
জেলোসদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সব আর্থিক ব্যবসাই ছায়া ব্যাংকিংয়ের আওতায় পড়ে। মিউচুয়াল ফান্ড, মানি মার্কেট ফান্ড, চীনের বেশির ভাগ সম্পদ ব্যবস্থাপনা তহবিল, বিকাশমান বাজারগুলোর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক কোম্পানি সবাই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে এবং এগুলো ব্যাংকের মতোই ধার দিচ্ছে। তবে ব্যাংকের মতো সে অর্থের নিরাপত্তার গ্যারান্টি পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।
সুদহার অস্বাভাবিক কম থাকায় মন্দা-পরবর্তী বছরগুলোয় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা বেশি আয়ের আশায় ছায়া ব্যাংকের দিকে ঝোঁকেন। গত ছয় বছরে ছায়া ব্যাংকিংয়ের আকার-কলেবর সবই অনেক বেড়েছে। আইএমএফের চোখে, ছায়া ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, তারা স্বল্পমেয়াদি তহবিলের ওপর নির্ভর করে। কোনো কারণে ভীত হয়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ তুলে নিতে চাইলেই বিপত্তিটি দেখা দেবে। ছায়া ব্যাংকের বিপর্যয় সার্বিক আর্থিক খাতকেও বিপদে ফেলবে। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব খুবই খারাপ হবে।
২০০৮ সালের বিপর্যয়ে এমনটিই দেখা গেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি মার্কেট ফান্ডগুলো বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার চাপে পড়ে এবং এর সঙ্গে এআইজির মতো বড় বীমা প্রতিষ্ঠান প্রায় ধসে পড়ে। সে আর্থিক বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক ফলাফল এখনো দেখছে বিশ্ব। তবে বাজারের বাস্তবতায় সে সময়ের পর থেকে ছায়া ব্যাংকিংয়ে প্রবৃদ্ধি আরো বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন মূলধারার ব্যাংকের প্রায় দ্বিগুণ সম্পদ আছে ছায়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে। তবে ইউরোপে তা ৬০ শতাংশে সীমিত আছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও এ হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ছায়া ব্যাংকিংয়ের ব্যাপ্তি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চীনে, যেখানে ব্যাংকগুলো সুদহার নিয়ে অনেক ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই আরো বেশি লভ্যাংশ পাওয়া যাবে-এমন আর্থিক সম্পদগুলোকে বেছে নেয়। মন্দার সময় ব্যাংক আমানত কখনই সে তালিকায় থাকে না। আইএমএফ বলছে, চীনে ছায়া ব্যাংকিং খাতের আকার দেশটির জিডিপির ৩৫-৫০ শতাংশের সমান এবং এ খাতকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা প্রয়োজন।
জেলোস বলেন, ব্যাংকের জন্য কঠোরতর বিধিবিধান প্রয়োগ করা হলে ছায়া ব্যাংকিংয়ের ব্যাপ্তি দ্রুত বাড়তে থাকে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রকৃত সুদহার বা সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক সম্পদের মুনাফা কম হলেও বিনিয়োগকারীরা অধিক মুনাফার আশায় ছায়া ব্যাংকগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়।
আইএমএফের এ বিশেষজ্ঞ স্বীকার করছেন, ছায়া ব্যাংকিং আর্থিক সেবার ব্যাপ্তি বাড়ায়, অনেক মানুষের কাছে ঋণ সুবিধা নিয়ে যায়, যারা সাধারণত প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সুফল পায় না, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। তবে নিয়ন্ত্রকদের অবশ্যই এ খাতের হালনাগাদ সব তথ্য-উপাত্ত রাখতে হবে। ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি নিরূপণেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
জেলোসের পরামর্শ, ‘নিয়ন্ত্রকদের উচিত আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি বহন করে এমন প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও প্রতিষ্ঠানকে আরো সূক্ষ্ম নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা। ছায়া ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি প্রশমনে কোন ক্ষেত্রে কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত-এ প্রশ্নের উত্তর কর্মকাণ্ডের ধরন ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: এএফপি।
ঢাকা, ৩ অক্টোবর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর





