বিশাল ব্যয়ভার সামাল দিতে কর আদায়ের দিকেই বেশি জোর দিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
প্রস্তাবিত বজেটের মূল লক্ষ্য হবে বর্তমানে অনসৃত রাজস্ব ও মুদ্রা নীতি কলা-কৌশলের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এ বিষয়ে রাজস্ব খাতে সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানোর কিছু পদক্ষেপসহ ব্যাপকভিত্তিক মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে আগামী অর্থ বছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী।  এর আগে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। এতে  সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী। এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে বাজেট উপস্থাপন করা হয়।  
বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর ও ভ্যাটের আওতা ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নতুন পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর করের বোঝা বাড়বে। অন্যদিকে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু সুবিধা ও ছাড়।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, মানব উন্নয়ন কার্যক্রম হবে অন্যতম খাত। মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে এই বাজেট হবে একটি মাইলফলক। রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রত্যাশা পূরণের এক চ্যালেঞ্জিং বাজেট।
নতুন ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে মোট খরচ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ২০ কোটি টাকা। এতে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৫শ ৩০ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি’র আকার ধরা হয়েছে ৮০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি থাকছে ৬৭ হাজার ৪শ ৯৮ কোটি টাকা। ভর্তুকি ধরা হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার কর রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে। (জিডিপির ১১.২ শতাংশ)।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এবারের বাজাটে ঘাটতি দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫.০ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ২৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। (জিডিপির ১.৮ শতাংশ) এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে ৪৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা এবং ব্যাংক বহি:ভূত উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ১২ হাজার ৫৬ কোটি টাকা।
বাষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বরাবরের মত আমরা আঞ্চলিক সমতা, উন্নত অবকাঠামো এবং গুনগত ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনা রেখে এডিবির উন্নয়ন কর্সূচির আকার নির্ধারণ করেছি।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে মানব সম্পদ খাতে ২৪.৩ শতাংশ, সার্বক কৃষিখাতে ২৫.৮ শতাংশ, বিদ্যুত ও জ্জালানি খাতে ১৪.৩ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১২.২৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এর আকার হবে ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোতে সামাজিক অবকাঠামোতে খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে মোট বরাদ্দের ২৪.১৬ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে মোট বরাদ্দের ৩০.১৫ শতাংশ এবং সাধারণ সেবা খাতে ২৩.৫৮ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত নতুন বাজেট যেমন প্রবৃদ্ধি সহায়ক হবে তেমনি তা মূল্যস্ফীতিকে সংযত রাখবে।
এছাড়া নতুন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৩ শতাংশ, ২০২১ সালে যা হবে ১১ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধি বাস্তবায়নে নীতি ও কৌশল উপস্থাপন করে অর্থমন্ত্রী জানান, বিদ্যুতের উৎপাদন ১০ হাজার মেঘাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার মেঘাওয়াটে উন্নীত করা। শিল্পে ২৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ লক্ষমাত্রা। বিনিয়োগ আকর্ষনের জন্য পিপিপি উৎসাহিত করা। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করব। ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য সুদের হার কমানো হবে।
রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণ কে ১৩.৫ শতাংশ থেকে আগামী ৫ বছরে ১৭ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ৩৮.৪০ শতাংশ আয়কর, ৩৭.৭৪ মূসক এবং বাকী ২৩.৮৬ শতাংশ শুল্ক খাত থেকে সংগৃহীত করা হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত আয়কর দাতা ১৮ লাখ হলেও কর দেন মাত্র ১২ লাখ।  তিনি নতুন অর্থবছরে রাজস্ব বিভাগের সংস্কারের উপর জোর দেন।  এবারের প্রস্তবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেনীর করদাতার করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তন না করে ২ লাখ ২০ হাজার করা হয়েছে।
এছাড়া প্রস্তবিত বাজেটে বিদ্যমান কর অবকাশ সুবিধা ২০১৫ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।  পুঁজিবাজারে স্টক এক্সচেঞ্জ সমূহের ৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব মন্ত্রী সভায় অনুমোদন করা হয়েছে। 
গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একনাগাড়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের এটি প্রথম বাজেট। এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংসদে পাঁচটি বাজেট পেশ করেছিল। এ ছাড়া, এ বাজেট হবে দেশের ৪৩তম বাজেট এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫তম বাজেট । আর অর্থমন্ত্রী হিসাবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের অষ্টম বাজেট।
বাজেট বক্তৃতা; বাজেটের সংক্ষিপ্তসার; বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি; সম্পূরক আর্থিক বিবৃতি; মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি; ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা : হালচিত্র, ২০১৪; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন : সাফল্যের অগ্রযাত্রা; রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা : উন্নয়নের পথে অভিযাত্রা; বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও অসমতা : উত্তরণের পথে যাত্রা; পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ; জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ, ২০১৪-১৫ (সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর জেলা); জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন; সংযুক্ত তহবিল প্রাপ্তি; অর্থনৈতিক সমীক্ষা; মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিসমূহ (অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন), মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিসমূহ (উন্নয়ন); এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ জাতীয় সংসদ হতে সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি : ২০১৪-১৫ এর একটি দলিল এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রণীত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যাবলী : ২০১৩-১৪ জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়।
এদিকে গত বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ কার্য-উপদেষ্টা কমিটির সভায় সংসদের বাজেট অধিবেশনের মেয়াদ ও কার্যক্রম চূড়ান্ত হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাজেট অধিবেশন চলবে আগামী ৩ জুলাই পর্যন্ত। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ৪৫ ঘন্টা আলোচনা হবে। ২৯ জুন ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট পাস করা হবে।
গত ৩ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। গত ১৮ মে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় দেয়া ক্ষমতা অনুযায়ী অধিবেশনের আহ্বান করেন ।
এদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের লিখিত ডকুমেন্টেসের বাইরেও www.mof.gov.bd, www.bangladesh.gov.bd, www.nbr-bd.org, www.plancom.gov.bd, www.imed.gov.bd, www.bdpressinform.org এবং www.pmo.gov.bd  ওয়েবসাইটে বাজেট ডকুমেন্ট পাওয়া যাবে।
রীতি অনুযায়ী বাজেট উপস্থাপনের পরদিন অর্থাৎ আগামীকাল শুক্রবার বিকেল ৪ টায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন অর্থমন্ত্রী।
[b]ঢাকা, ৫ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]