বিশ্বের অনেক দেশেই সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদন করা হয়। তাদের দেখাদেখি বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে সুগারবিট চাষ। উদ্দেশ্য, দেশের চিনিকল রক্ষা ও সংকট মোকাবেলা করা। এরই মধ্যে আখের বিকল্প সুগারবিট চাষ এবং গুড় উৎপাদনে ৩ বছরের পাইলট প্রকল্পে সফল হয়েছে ঠাকুরগাঁও আঞ্চলিক ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র।
সুগারবিট প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে চাষের পাশাপাশি আগামী ২০১৭-১৮ সালের মাড়াই মৌসুমে ঠাকুরগাঁও চিনিকল এই বিট থেকে চিনি উৎপাদন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মিল কর্তৃপক্ষ। মুলা বা শালগমের ন্যায় দেখতে প্রতিটি সুগারবিটের ওজন হয় ৫-৬ কেজি। গবেষণা কেন্দ্রে সুগারবিটের রস থেকে গুড়ও তৈরি করা হয়। খেতে স্বাদও অপূর্ব। চিনি আহরণের হারও আখের চাইতে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থাৎ ১২-১৪ শতাংশ।
এখানে সুগারবিটের ৫টি জাত চাষ করা হচ্ছে। তা হলো- সুভ্রা, কাভেরী, সি-গ্রিন, ইবি ০৫১৩, ০৬১৬, ০৬১৭ ও ০৬২১ জাত। সুগারবিটের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৮০-১০০ মেট্রিকটন পর্যন্ত। সুগারবিট একটি দ্বি-বর্ষী শস্য। উচু, মাঝারি উঁচু ও সমতল জমির দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি যেখানে পানি দাঁড়ায় না এমন মাটি সুগারবিটের জন্য উত্তম। সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এর বীজ বপন করতে হয় এবং অব্যাহত পরিচর্যায় ৬ মাসের মধ্যে এর ফলন তোলা যায়।
বিজ্ঞানীরা জানান, আখ চাষ করতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ মাস। অথচ সুগারবিট আবাদ করে চিনি উৎপাদন পর্যন্ত সময় লাগে ৫ থেকে ৬ মাস। ফলনের দিক দিয়ে আখের চাইতে সুগার বিটের উৎপাদন বেশি অর্থাৎ হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় প্রায় ৮০-১০০ টন। কষ্টের বিষয় একটাই বাংলাদেশের জলবায়ুতে এর বীজ উৎপন্ন করা কঠিন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন থেকে প্রতি বছরই বীজ আমদানি করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থ বছরে ঠাকুরগাঁও আঞ্চলিক ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রে সুগারবিট চাষ ও চিনি উৎপাদনের গবেষণা শুরু হয়। ৩ বছরের পাইলট প্রকল্পের মেয়াদ শেষে চূড়ান্ত ভাবে সফলতা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, আখে যেখানে চিনি থাকে ৭/৮ শতাংশ সেখানে সুগারবিটে চিনির পরিমাণ প্রায় ১৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।
এরইমধ্যে স্থানীয় ভাবে এই সুগারবিট থেকে গুড় তৈরি করে প্রান্তিক চাষিদের প্রদর্শনী ও চাষাবাদের কলাকৌশল নিয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসেই সুগারবিট উৎপাদন করে মিলে সরবরাহ করে আর্থিক ভাবে লাভবান হতে পারবেন কৃষকরা।
এদিকে সুগারবিট চাষাবাদে কৃষকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। আখচাষিরা জানান, সুগার বিট চাষের কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা। সুগার বিটের সাথে অন্যান্য সাথী ফসল করা যায়। এছাড়াও আখের সাথে সুগার বিটও চাষ করা যায়। এলাকার অনেক কৃষক আখের বদলে সুগারবিট চাষ করার আগ্রহ দেখা গেছে।
জেলা আখচাষি সমিতির সভাপতি জানান, সুগারবিট চাষ করে এলাকার চাষিরা অল্প সময়ে প্রচুর টাকা আয় করতে পারবে। ইতোমধ্যে তারা কয়েকশ কৃষক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও আঞ্চলিক ইক্ষু গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক মামুনুর রশিদ জানান, বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলায় শীত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। এ এলাকা সুগারবিট চাষের উপযোগী। ইতিমধ্যে পরীক্ষাগারে আমরা সুগারবিট চাষ ও গুড় উৎপাদনে সফল হয়েছি। সুগারবিট সম্ভাবনাময় ফসল। এটি চাষের মাধ্যমে দেশের চিনি ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব।
ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের ব্যবস্থপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ জানান, সুগারবিট উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজ যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রকল্পের ডিরেক্টর ও কনসালটেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপন করা হলে ২০১৭-১৮ সালের মাড়াই মৌসুমে সুগার বিট থেকে চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
এআর





