রাজনীতিবিদরা সচেতন না হলে একটা সময় এনজিওগুলো রাষ্ট্রকে গিলে খাবে বলে মন্তব্য করেছেন এনজিও সংস্থা ‘কোষ্ট ট্রাস্ট’ এর নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী।
মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) এর সহযোগিতায় কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সরকার কর্তৃক ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ কমানোর পরিকল্পনার পরিণাম তুলে ধরে তা ‘না কমানো’র দাবিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ কমলে ছোট প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বক্তারা।
তারা বলেন, এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় অর্থনীতিতে এবং বাধাগ্রস্ত হবে সুষম ও সমতাভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকগণ তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নানান সমস্যার কথা উঠে আসে।
তারা বলেন, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি(এমআরএ) কর্তৃক গঠিত একটি কমিটি বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জের হার পুনর্মূল্যায়ন করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট যে এ মুহূর্তে ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস সার্জ কমানো হলে, ছোট ছোট সংস্থাগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ হিসাবে তারা উল্লেখ করেন, এমআরএ’র তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা ৬৫৯ টি। এর মধ্যে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৬শরও বেশি। যারা বর্তমানে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ২৭ শতাংশ উঠিয়ে কোনভাবে টিকে আছে।
বক্তারা আরো বলেন, এসব সংস্থায় বর্তমানে প্রায় দুই লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। এসকল প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি।
তারা বলেন, যদি এ চার্জ কমানো হয় তাহলে এই ছোট প্র্তিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যতীত আর কোন উপায় থাকবে না। তাই প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের দাবি, ২৭ শতাংশ সার্ভিস চার্জ কমানোতো যাবেই না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে সার্ভিস চার্জ আরো বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।
তারা বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সারা বিশ্বের যে সকল রাষ্ট্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান চালু আছে, কোথাও ৩৫ ভাগের নিচে সার্ভিস চার্জ নেই।
রেজাউল করিম বলেন, সরকারের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে ফান্ডিংয়ের মাত্র ২ শতাংশ যায় লোকাল এনজিওর কাছে। বাকী ১৮ শতাংশ ঢাকার এনজিওগুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়।
তিনি বলেন, আমাদের নীতি নির্ধারকরা বুঝেও বুঝতে চাননা। কতিপয় প্রভাবশালী মহল সব নিয়ন্ত্রন করছে। মাইক্রোফাইনান্স সেক্টরের ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রন করে মাত্র দুইটা এনজিও। তিনি বলেন, যদি ছোট এনজিওগুলো শেষ হয়ে যায়, তাহলে কার লাভ আপনারা বুঝতে পেরেছেন। তারা যুক্তি দেখায় ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ সুতরাং যারা টিকতে পারবেনা তারা মারা যাবে। তিনি বলেন, ঠিক আছে তাহলে সমাজের সব দরিদ্ররা মারা যাক, যাদের সামর্থ আছে তারা বেঁচে থাকুক। তিনি প্রশ্ন রাখেন এটা কি গ্রহনযোগ্য?
রেজাউল বলেন, আমরা একটি ব্যাল্যান্স সেক্টর চাই, যেখানে মনোপোলি নেই। এক সময় আসবে যখন এনজিওগুলো রাষ্ট্রকে গিলে খাবে। যদি রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা সেভাবে বুঝতে না পারেন, তাহলে তারা ভুল করবেন।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের উন্নয়নের মডেল হচ্ছে এখন ২১ তলা এবং ১৪তলা বিল্ডিং। আমাদের এনজিও পরিচালকদের কারো কারো ধারণা আমি যদি ২১ তলা বিল্ডিং করতে না পারি তাহলে অন্তত ৫তলা বিল্ডিংতো করতে পারি।
রেজাউল বলেন, এই সব ডেভেলপমেন্ট চিন্তা ভুলে যান। এ ডেভেলপমেন্টের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে অনেক লোক নিত্য নতুনভাবে সমালোচনা করছে এবং সেই সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা নয়।
তিনি বলেন, আমাদেরকে ডেভেলপমেন্ট এপ্রোজ ঠিক করতে হবে। ডেভেলপমেন্ট মানে ২১তলা বা ১৪তলা বিল্ডিং নয়। মানুষের সাথে থাকার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। মানুষ যদি না খেতে পায়, এনজিও লিডাররাও না খেয়ে থাকবেন। তিনি বলেন, মানুষ যদি টেম্পুতে চড়ে, কেন এনজিও লিডার পাজারোতে চড়বেন? এ বৈষম্য আমরা মানতে পারিনা।
ইনাফি বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আতিকুন্নবীর পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, আরস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সামছুল আলম, সেবা আর্থ-সামাজিক সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শোভা রানি মন্ডল, দুস্থ পরিবার উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আরজুমান বেগম, বিইডিওর পরিচালক ডা. তাসনিম আহমেদ, এইউবির নির্বাহী পরিচালক মুজিবুল হক ফারুক, উষার নির্বাহী পরিচালক তাজুল ইসলাম, এনজিও ফেডারেশনের পরিচালক মোসাদ্দেক আলী, সিডিএফ এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আউয়াল প্রমুখ।





