অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘ তিন মাসের বনিবনার পর অবশেষে চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে ৬০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৩৮ হাজার আটশ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ২১ হাজার দুইশ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় পরিকল্পনা সচিব ভুঁইয়া সফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রথমে ৫৪ হাজার কোটি টাকা সংশোধিত এডিপি হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা ১ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ আজ (বৃহস্পতিবার) তা আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা বিবেচনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অগ্রগতির কথা চিন্তা করে সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিবারের মতোই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেই এটা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
“আমরা সবগুলো প্রকল্প ভালোভাবে মূল্যায়ন করেছি। প্রকল্প চাহিদা, সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি ৫ হাজার কোটি বাড়ানো হয়েছে। আর এই বাড়তি টাকা সম্পূর্ণভাবে সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে আসবে।”
তবে ৫৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হলেও এই বাড়তি টাকা কোন কোন খাতে বা কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা বরাদ্দ পাবে সে সম্পর্কে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।
মুস্তফা কামাল বলেন, এটা নিয়ে চূড়ান্তভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এজন্য অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের বসতে হবে। এটা আলোচনা করে ঠিক করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী চূড়ান্তভাবে সবকিছু জানতে আরও অপেক্ষা করতে বলেন।
এ সময় কথা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আসলে আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। বছরের শেষে আমাদের বাস্তবায়ন বেড়ে যায়। আসলে কাজ আগে হয়ে যায়, কিন্তু অর্থছাড় বছরের শেষে হয়। এতে অবশ্য আমাদের দুর্বলতা রযেছে। আমাদের তো চাহিদা অনুযায়ী দাবি জানাতে হবে।
মন্ত্রী শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, গুণগত মান নিশ্চিতের উপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়েরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের তো সোর্স অব আর্নিং (আয়ের উৎস) থাকতে হবে। আমি মনে করি সংসদীয় গণতন্ত্রে এটা হবেই। পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধ তো থাকবেই। তবে সবকিছু মিলেই চলতে হবে। দিনশেষে আমরা এক হবই।
এদিকে এডিপি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে মুস্তফা কামাল বলেন, এ বছর আমাদের বাস্তবায়ন ভালো হয়েছে। সাত থেকে আট মাসে এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৮ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে (২০১২-১৩) হয়েছে ৪৪ শতাংশ, এর আগে ৩৮ এবং এরও আগে ৩৭ শতাংশ। তাই এডিপির বাস্তবায়ন ভালোই।
বাজেট ঘাটতির বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতি স্বীকৃত। এর বেশি কোনো দেশেই হয় না। গেল বছরে আমাদের ঘাটতি হয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই এবারও তা ৫ শতাংশের বেশি হবে না।
৫৫ হাজার কোটি টাকা ধরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন খাতে। এ খাতের সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলওয়ে-নৌ ও বেসামরিক পরিবহনসহ মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার চারশ ৫০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ছয় হাজার ৯৩৮ কোটি ৮৭ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে দুই হাজার পাঁচশ ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাত হাজার আটশ চার কোটি ১১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের চার হাজার পাঁচশ ৯৫ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে তিন হাজার দুইশ ৯ কোটি ১১ লাখ টাকা।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা শিক্ষা ও ধর্ম খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাত হাজার একশ ৮৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের পাঁচ হাজার পাঁচশ ৭৩ কোটি ৪৬ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে এক হাজার ছয়শ ১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
অন্যান্য খাতে বরাদ্দ হচ্ছে, কৃষি খাতে তিন হাজার একশ ৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের দুই হাজার একশ ১০ কোটি ৮৫ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে এক হাজার ৭২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে মোট ছয় হাজার ৭০ কোটি ১১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের তিন হাজার ৯৪৩ কোটি ৭০ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তার দুই হাজার একশ ২৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। পানিসম্পদ খাতে মোট বরাদ্দ এক হাজার ছয়শ ৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের এক হাজার একশ ৮৭ কোটি ৯৪ লাখ এবং বৈদেশিক চারশ ৪৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
শিল্প খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই হাজার সাতশ ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের পাঁচশ ২৩ কোটি পাঁচ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে দুই হাজার একশ ৯৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে মোট বরাদ্দ এক হাজার ছয়শ ৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের এক হাজার ৬৫ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে পাঁচশ ৭৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
যোগাযোগ খাতে মোট বরাদ্দ ৭৮৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ১৭৮ কোটি ৯৬ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৬০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন খাতে মোট প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৪ হাজার ৭২৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৩ হাজার ৩১ কোটি ৩১ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে মোট ২৫৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ২৪১ কোটি ২৮ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ১৪ কোটি ৬৪ টাকা।
স্বাস্থ্য,পুষ্টি,জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে মোট বরাদ্দ ৪ হাজার ১০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ১ হাজার ৫০৮ কোটি ৮০ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ২ হ্জাার ৫০১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। গণসংযোগ খাতে মোট বরাদ্দ ৮১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৬৮ কোটি ৯০ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ১৩ কোটি টাকা। সমাজকল্যাণ, মহিলা বিষয়ক ও যুব উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ ৪৪৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ২৩৪ কোটি ৪২ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ ১ হাজার ৩১০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৩৬৬ কোটি ৯ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ৯৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১ হাজার ৫২১ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৪৯২ কোটি ২৫ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ১ হাজার ২৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান খাতে মোট বরাদ্দ ৩৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ২২৪ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তা ১০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
[b]ঢাকা, ৩ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]
অর্থনীতি
৬০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি অনুমোদন
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘ তিন মাসের বনিবনার পর অবশেষে চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে।





