নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন কৃষি ও হিমায়িত পণ্য রফতানিকারকরা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এসব খাতের রফতানিতে।
এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় প্রায় ৯০ ধরনের কৃষি, মৎস্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করেও বাড়ানো যাচ্ছে না বৈদেশিক আয়।
উল্টো মাস ও বছরের হিসাবে এ খাতে রফতানি আয় আগের চেয়ে ক্রমাতগত কমছে। বিশেষে করে ইউরোপের বড় বাজার হারাতে বসেছে। গত তিন বছরে গড়ে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
রফতানি পণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্যামিকেল, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছে আমদানীকারক দেশগুলো। ফলে তারা বিভিন্ন শর্ত দিয়ে পণ্য নেয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে।
সংশ্লিষ্টরা এর জন্য দেশের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে দায়ী করেছে। তবে রফতানীকারকরা বলছেন, পণ্য রফতানিতে কার্গো সমস্যা, ছাড়পত্র না পাওয়াসহ নানা জটিলতায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র জানায়, কিছু অসাধু এবং অনভিজ্ঞ রফতানিকারকই এর জন্য দায়ী। অতিমুনাফার লোভে গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষ করে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর জেলি মেশানো চিংড়ি রফতানি করেছেন কিছু অসাধু রফতানিকারক।
যা বন্দর থেকে মাল খালাসের আগে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায়-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে যায়। একইভাবে পান রফতানির ক্ষেত্রেও সালমোলাইন নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়েছে। শাকসবজি ও ফলমূলে পাওয়া গেছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।
সবজিতে সরাসরি পাওয়া গেছে পোকামাকড়। এছাড়া সবজি রফতানির ক্ষেত্রে ফাইটোসেনেটারি সার্টিফিকেট (পিসি) নকল করার মত অপরাধও সংঘটিত হয়। আবার এ সনদ কোনো ল্যাব টেস্ট ছাড়াই চোখের দেখায় দিয়ে দেয়া হয়।
এসব কারণে গত দুই বছরে প্রায় দু’শতাধিক চালান ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকরা। এতে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের বাজারে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্য হয়েছে।
যার ফলে কৃষি পণ্য রফতানির বড় বাজার ইউরোপ ২০১৩ সাল থেকেই এসব পণ্যকে ‘ক্রিটিক্যাল কমোডিটি’-তালিকায় রেখে রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্র্থবছর কৃষিখাতের পণ্য রফতানি থেকে ৬০ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি ডলার আয় কম হয়েছে।
এর মধ্যে সবজি রফতানিতে আগের বছরের চেয়ে এবার লক্ষ্যমাত্রাই কম ধরা হয় দেড় কোটি ডলার। যেখানে প্রথম চার মাসের হিসাবেও পিছিয়ে ৬০ লাখ ডলার। এছাড়া কাট ফ্লাওয়ার ও ফলিজ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৯৯ দশমিক ৫৭ ভাগ, ফলমূলে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৯৭ দশমিক ৩১ ভাগ।
তামাকজাত দ্রব্যেরও প্রবৃদ্ধি কমেছে ২৮ দশমিক ৬৬ ভাগ। এছাড়া হিমায়িত খাদ্যপণ্য রফতানিতে একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে রয়েছে ২৮ শতাংশ এবং আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায় ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে সবজিতে আয় ছিল ১৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। পান রফতানি বন্ধের ওই অর্থবছরেই দেশ থেকে ১০ কোটি ৩২ লাখ ডলারের সবজি রফতানি হয়েছে। যা আগের বছরের চেয়ে রফতানি আয় কমে যায় ৩০ শতাংশ।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের সবজি রফতানিতে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। গত তিন বছরের গড়ে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ফ্রুট, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন এ প্রসঙ্গে অবশ্য দাবি করেন, ইউরোপের দেশগুলোতে পান, সবজি ও ফলে সরাসরি পাঠানো নিষেধাজ্ঞা থাকায় রফতানি কমেছে।
তবে এক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে পরিবহন সমস্যা। এদেশ থেকে সবজি পরিবহনে বাড়তি ব্যয়। কার্গোতেও মিলে না পর্যাপ্ত জায়গা। এসব কাঁচা পণ্য সময়মতো রফতানি করা না গেলে সবই নষ্ট হয়। এতে রফতানির পরিমাণ এবং আয় দুটোই কমে যায়।
ইউরোপে পান রফতানি করতে পারলে এ খাতের আয় আরও বাড়বে বলে তিনি জানান। আর রফতানিকারকরা বলছেন, রফতানি আয়ে পিছিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হিসাবে তারা ছাড়পত্র না পাওয়া এবং কিছু সবজিপণ্য রফতানি সরকার নিজেই বন্ধ রাখায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মাহমুদ.





