বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। বুধবার ‘বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার ২০১৩’ প্রদানের জন্যে যৌথভাবে মনোনীত দু’জন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ (প্রয়াত) অধ্যাপক ড.মোজাফফর আহমদ ও ড. স্বদেশ রঞ্জন বোস-এর উত্তরাধিকারীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে স্বর্ণপদক, নগদ অর্থ ও ক্রেস্ট তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণা ও চিন্তামূলক লেখালেখিসহ মৌলিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদেরকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড.মোজাফফর আহমদ
মোজাফফর আহমদ অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘ চল্লিশ বছর। সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন তিনি। এর দু’বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ) যোগদান করেন অধ্যাপক হিসেবে।
আইবিএ-তে ত্রিশ বছর অধ্যাপনা করে ২০০৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মাঝে তিন বছর বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। ব্যতিক্রমী ও বহুমাত্রিক গবেষক ড. মোজাফফর আহমদের লেখালেখির শুরু কবিতা ও গল্প দিয়ে।
এরপর অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাবলিক এন্টারপ্রাইজ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শ্রমিক সম্পর্ক, পল্লী উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার, সুশাসন, গণতন্ত্র, নির্বাচনসহ অনেক বিষয়ের ওপর মৌলিক গবেষণা ও সুচিন্তিত মতামত প্রদান করে গেছেন। তাঁর এসব গবেষণা ও মতামত জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। তাঁর বেশ কয়েকটি গবেষণাধর্মী বই এবং দেশ-বিদেশের বিখ্যাত জার্নালে কয়েকশ’ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সাথে যৌথভাবে প্রণীত তাঁর ‘চঁনষরপ ঊহঃবৎঢ়ৎরংব রহ ধহ ওহঃবৎসবফরধঃব জবমরসব’ প্রকাশনাটি রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সের ওপরও তাঁর বেশকিছু লেখা রয়েছে। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একজন সফল শিক্ষক, প্রশিক্ষক বা প্রবন্ধকারই ছিলেন না, ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। তাঁর নেতৃতে¦
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল। তিনি দীর্ঘদিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। সবশেষে টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং দেশব্যাপী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্যে নাগরিক’ (সুজন) এর সভাপতি হিসেবে কাজ করছিলেন। যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সঙ্গেও।
ড. স্বদেশ রঞ্জন বোস
ড. স্বদেশ রঞ্জন বোস ছিলেন দেশের একজন কৃতী অর্থনীতিবিদ। বরিশালের বিএম কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনাবহুল সংগ্রামী জীবনের অধিকারী স্বদেশ বোস শৈশবেই মা-বাবাকে হারান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বরিশালে দাঙ্গা হলে তাঁর ভাই-বোনেরা ভারতে চলে যান। তবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ স্বদেশ বোস বরিশালেই থেকে যান। মহান ভাষা আন্দোলনে যোগদানের জন্যে তাঁকে জেল খাটতে হয়।
জেলখানায় অমানুষিক নির্যাতনের ফলে তিনি মাথায় ও হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন। নানা অজুহাতে আট বছর জেল খেটে ১৯৫৬ সালে মুক্তি পান। জেল খাটার কারণে বিএম কলেজ তাঁকে পুনঃভর্তি না করালে মফস্বলের একটি কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে রেকর্ড নম্বর পেয়ে বিএ পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। এখানে পড়ার সময়ও তাঁকে সপ্তাহে একদিন থানায় হাজিরা দিতে হতো। ১৯৬০ সালে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন।
পরের বছর যোগ দেন পাকিস্তান উন্নয়ন অর্থনীতি প্রতিষ্ঠানে (পিআইডিই)। ১৯৬২ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন পিএইচডি করার জন্যে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ইউএস এম্বাসি তাঁকে ভিসা দেয়নি। পরে একই বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডনের ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
ছেষট্টির ছয় দফার সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের প্ল্যানিং সেলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়নের দিকনির্দেশনা প্রদানে তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস এর পুনঃর্গঠনেও তিনি গুরুত¦পূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ নানা বিষয়ে তিনি গভীর সব গবেষণা কর্ম সম্পন্ন করেছেন। ১৯৭৪ সালে বিশ্বব্যাংকের চাকরি নিয়ে তিনি আমেরিকা চলে যান। ২১ বছর বিশ্বব্যাংকে চাকরির পর তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
অর্থনীতিতে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি’র স্বর্ণপদক (মরণোত্তর) ও ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রাপ্ত ড. বোস নীতিনির্ধারণী গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন গতিধারা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ঢাকা, ২০ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর





