চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত পণ্যভর্তি কনটেইনার অবৈধভাবে খালাস হচ্ছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এসব পাচার করা কনটেইনারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তায় হুমকির বিষয়টিও জড়িত।
তাই ঝুঁকি এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রিকনসিলেয়েশনের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা, কমিটি করে বিশেষ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কনটেইনার মনিটরিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পাঠানো এক চিঠিতে এসব কথা বলা হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কাস্টম হাউসে যথাসময়ে নিলাম অনুষ্ঠান ও পরবর্তী সময়ে পণ্য ছাড়ের আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণ করা না হলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে এর উপযোগিতা না থাকায় সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাস্তব উদাহরণ কারনেট সুবিধায় আমদানি করা গাড়ি বিলম্বে নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করা। কারনেট সুবিধার মাধ্যমে আমদানি করা এসব গাড়ি নিলামে অত্যন্ত কম মূল্যে দরপত্র উঠেছে। সরকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, যাদের কনটেইনার পরীক্ষণ ও শুল্কায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা তেমন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারছেন না। কোনো কোনো অফডকে নির্ধারিত ৩৭টি পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কে পণ্য আনয়ন করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ এসেছে। অনচেসিস ডেলিভারি ও কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের ক্ষেত্রেও কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণ পর্যাপ্ত নয়।
কনটেইনার স্ক্যানিং মেশিনে যেসব কর্মকর্তাকে স্ক্যানিং ডিউটি দেওয়া হয় তারা এক্সরে ইমেজ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না মর্মেও এ দপ্তরের কাছে তথ্য আছে। এ বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা অন্যত্র বদলি হওয়ায় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চোরাচালান সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
এতে বলা হয়, বহির্নোঙরে যেসব জাহাজ অবস্থান করে সেখানেও কাস্টমসের নজরদারি সীমিত। এফ ডিভিশন/রামেজিংয়ের এনফোর্সমেন্ট-সংক্রান্ত কার্যক্রম ততটা দৃশ্যমান নয়। অথচ নোঙরকৃত জাহাজ থেকে অবৈধসহ শুল্ক ফাঁকিকৃত পণ্য নৌযোগে অথবা ছোট-ছোট বোটের মাধ্যমে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে যৌথ মহড়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে এ দপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। পেশাদারিত্ব নিয়ে এসব ইউনিট কর্তৃক নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে কাস্টম হাউসের নজরদারির বিষয়টি দৃশ্যমান করা যেতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো অন্য এক গোপন চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ফালতুদের (বহিরাগত) বিতাড়নের তাগিদ দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, কাস্টম হাউসে অবস্থান করে তারা অসাধু ব্যবসায়ীদের সোর্সগিরি, অনৈতিক লেনদেনের মধ্যস্থতা, গোপনীয়তা ফাঁস, অনৈতিক কর্মকা-সহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
চিঠিতে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ফালতুরা স্পর্শকাতর স্থাপনায় অবস্থান করে দীর্ঘদিন ধরে নথি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এদের বিরুদ্ধে শুল্কায়ন কার্যক্রমের নথি গায়েব ও অসাধু ব্যবসায়ীদের পক্ষে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনায় আবদুল কাদের, মিজান, মহিন উদ্দিন ও হোসেন এ চারজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। অপরাধে জড়িত একাধিক ফালতুর তালিকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হয়। স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান হওয়ায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থার এসব ফালতুর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন শাখায় কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা তৈরির ওপরও জোর দেওয়া, জনবল নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়টিও ত্বরান্বিত করার সুপারিশও করা হয়।
অপর এক চিঠিতে বলা হয়, বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ডিং কার্যক্রম রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বন্ড সুবিধা প্রযোজ্য থাকাটা সমীচীন নয় মর্মে প্রতীয়মান। যেসব প্রতিষ্ঠান হোম কনজাম্পশন সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তারা বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করলেও একইভাবে অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান সমান্তরাল সুবিধা পাচ্ছে না।
এতে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা-বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের সমতানীতি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।সুবিধাবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো অপর এক চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমসে যুগ্ম কমিশনার থেকে শুরু করে নিম্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা/কর্মচারীর সংখ্যা অনুমোদিত জনবলের অর্ধেকেরও কম রয়েছে।
যুগ্ম-কমিশনার পদমর্যাদার অনুমোদিত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন, ডেপুটি/সহকারী কমিশনার অনুমোদিত সংখ্যা ৬৩-এর বিপরীতে রয়েছে ২৬ জন। একইভাবে রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমোদিত ১১৯ ও ৪৮৭-এর স্থলে ৬২ ও ১৬৬ জন রয়েছে। কাজের গতি আনতে এসব জনবল বাড়ানো জরুরি।
মাহমুদ.





