ঢাকা: কনকনে শীত। সঙ্গে ঘন কুয়াশার চাদর। প্রকৃতির এ বিরূপ আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো বীজতলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবুজ বীজতলা এরই মধ্যে হলুদ বর্ণ ধারণ শুরু করেছে। এ অবস্থা আরো কিছুদিন দীর্ঘ হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এর আঘাতটা গিয়ে পড়বে চলতি মৌসুমের বোরো উৎপাদনে।
চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই কনকনে শীতে কাঁপছে গোটা দেশ। এরপর তিনদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। ঘন কুয়াশার আড়ালে চলে গেছে সূর্য। এ অবস্থা আরো কয়েক দিন চলবে বলে মনে করছে আবহাওয়া অফিস। পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মাসের শেষ দিকে আরো একবার একই পরিস্থিতির জন্য কৃষককে তৈরি থাকতে হবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে। এর বিপরীতে বীজতলা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ হেক্টর জমিতে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় উপকরণ সংকটের কারণে বীজতলা তৈরির এ লক্ষ্য পূরণ হয়নি। সব মিলিয়ে বোরো বীজতলা তৈরি হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে, লক্ষ্যমাত্রার যা প্রায় ৯৬ শতাংশ। এ বীজতলার জন্য নতুন বিপত্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো বীজতলায় কুয়াশা না থাকলে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রাও সহনশীল। কিন্তু কুয়াশা পড়লে চারা হলুদ হয়ে যাবে। এ চারা রোপণ করলে উৎপাদন কমে যাবে। কুয়াশা দীর্ঘ হলে চারা মরেও যেতে পারে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের সঙ্গে কথা বলে প্রতিনিধিরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবার জ্বালানি তেল, বীজ ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। শেষ মুহূর্তে অনেকে বেশি দামে সার ও তেল কিনে বীজতলা তৈরি করেছেন। রোপণের আগে চারা নষ্ট হয়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষতিতে পড়তে হবে তাদের। কারণ এখন নতুনভাবে আর বীজতলা তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে এবার বোরো আবাদের লক্ষ্য পূরণে সংশয় দেখা দেবে।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ এলাকার কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার বোরো আবাদের জন্য ৩০ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছি। শীত ও কুয়াশার কারণে বীজতলা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।’
একই কথা বলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা গ্রামের কৃষক আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘এবার ছয় বিঘা জমিতে বোরো চাষের জন্য ১০ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছি। এক সপ্তাহ আগে চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে চারার ডগা লালচে হয়ে গেছে। এসব চারা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব নয়। চারা রোপণের পরিকল্পনা তাই বাদ দিতে হয়েছে।’
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। গত কয়েক দিন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে না নামলেও ঘন কুয়াশার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ অনুভূত হয়। মূলত ভারতের দিল্লি থেকে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য হয়ে ঘন কুয়াশার আবরণটি বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আর বাতাসে জলীয়বাষ্প জমে ভারী হয়ে তা বৃষ্টির মতো ঝরছে। তাপমাত্রার বিবেচনায় দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ বয়ে না গেলেও কিছু জেলায় এ ধারা আরো কিছুদিন চলমান থাকবে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকের করণীয় বিষয়ে কাজ করছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান।
ডিএইর মহাপরিচালক আবু হানিফ মিয়া বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় লিফলেট ও স্থানীয়ভাবে মাইকিং করা হয়েছে। ক্ষতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পরিসংখ্যান না এলেও আগেভাগেই কৃষকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে।
শীত থেকে বীজতলা রক্ষায় সন্ধ্যার পর তা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়ার পরামর্শ দেন আবু হানিফ মিয়া। তিনি বলেন, চারা উত্তোলন না করা পর্যন্ত প্রতিদিন সকালে বীজতলার ঠাণ্ডা পানি বা শিশির দড়ি টেনে সরিয়ে ফেলতে হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন পানি সরবরাহ করতে হবে। পানিতে পটাশ মিশিয়ে স্প্রে করলেও ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আগেই ১০ লাখ হেক্টরের মতো জমিতে বোরো আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। হাওর অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা, বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনায় আবাদের অগ্রগতি ভালো হলেও পিছিয়ে রয়েছে উত্তরের জেলা রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া। চারা রোপণে পিছিয়ে আছে লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও জেলাও। শীতের দাপট দীর্ঘ হলে এসব এলাকার বোরো উৎপাদন বড় ধরনের ধাক্কা খাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বোরো বীজতলার পাশাপাশি শীতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যান্য রবিশস্যও। তেলজাতীয় ফসল, বিশেষ করে সরিষায় বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। যারা দেরিতে শাক-সবজির আবাদ করেছেন, বিপাকে পড়েছেন তারাও। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ভুট্টা, সয়াবিন, গম ও মুগ আবাদ। মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ, রসুন ও ধনিয়া এবং ডালজাতীয় ফসল খেসারি, মাষকলাই, মোটর, ফ্যালন ও মুগেরও ক্ষতি হচ্ছে। খবর বণিক বার্তা।
অর্থনীতি
কনকনে শীতে ক্ষতিগ্রস্ত বোরো বীজতলা
ঢাকা: কনকনে শীত। সঙ্গে ঘন কুয়াশার চাদর। প্রকৃতির এ বিরূপ আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো বীজতলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবুজ বীজতলা এরই মধ্যে হলুদ বর্ণ ধারণ শুরু করেছে। এ অবস্থা আরো কিছুদিন দীর্ঘ হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এর আঘাতটা গিয়ে পড়বে চলতি মৌসুমের বোরো উৎপাদনে।





