প্রস্তাবিত ২০১৪-১৫ বাজেটে ভ্যাট ও করের জাল বিস্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে। আবার নতুন অনেক খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে। বেশ কিছু সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে এসব খাতের সেবার মূল্য অনেক বেড়ে যাবে যা সাধারণ মানুষের উপরে চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এনবিআর-বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে ৫ হাজার ৫৭২ কোটি এবং করবহির্ভূত খাত থেকে ২৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে।
ঘাটতি ধরা হচ্ছে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থে মেটানো হবে। উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।এখন রাজস্ব আয়ের ৮১ শতাংশ আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। তার মানে, সরকার আশা করছে যে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি রাজস্ব আয় হবে। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আগামী বছর রাজস্ব বোর্ডের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। মূলত আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের ওপর নির্ভর করায় শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বেশ কঠিন হবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে বাজেটে কর নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। অর্থবিলে এ সম্পর্কে বলা হলেও তা আছে খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জনপ্রিয় অনেক বিষয় ও কর খাতের সংস্কারের সাফল্যের বর্ণনা দিয়েছেন। কর আহরণ নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও নতুন করারোপের অস্পষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কোনো কথাই বলেননি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, নতুন বাজেটে অস্পষ্টভাবে বেশকিছু খাতে উৎসে কর ও অগ্রিম করের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে বোতলজাত পানির ভ্যাটের ভিত্তিমূল্যের ওপর ৩ শতাংশ উৎসে কর, আমদানি পর্যায়ে অন্যান্য পণ্যের মতো স্বর্ণ, রৌপ্য ও সেলফোন সেটের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর, ইজারা দলিল রেজিস্ট্রেশনে দলিলমূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর, কুইক রেন্টালের উৎসে কর কর্তন ৬ শতাংশ, জীবন বীমার ক্ষেত্রে পরিশোধিত প্রিমিয়ামের অতিরিক্ত মুনাফা প্রদানের ক্ষেত্রে মোট মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ আয়কর, ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল বা ডিবেঞ্চারের সুদের ওপর ৫ শতাংশ উেস কর, ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর প্রাপ্ত কমিশন ও ইনসেনটিভ বোনাস কিংবা একই ধরনের কোনো প্রাপ্তির ওপর ৩ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করেছে সরকার। কিন্ত বাজেট বক্তব্য বা অর্থ বিলে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।
আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি করারোপ হয়েছে মোবাইল কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। নতুন অর্থবছরে মোবাইল কোম্পানির লাইসেন্স ফি, স্পেকট্রাম লাইসেন্স ফি, লভ্যাংশ ভাগাভাগির অর্থ পরিশোধকালে ১০ শতাংশ উৎসে করারোপ করা হয়েছে। এ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনাও করছে সরকার। তবে বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার প্রত্যক্ষ করের কোনো অংশেই উল্লেখ নেই।
নতুন অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ট্যারিফ মূল্য বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেল শোধানগার কোম্পানি বা বিপণনকারী ডিলার কিংবা এজেন্টে কর হার বাড়ানো হয়েছে। মূলত জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিলারবা এজেন্টদের (পেট্রল পাম্প ব্যতীত) তেল সরবরাহের বিপরীতে বিল পরিশোধকালে মোট অঙ্কের ওপর ১ শতাংশ হারে এবং জ্বালানি তেল শোধনাগার কোম্পানির ক্ষেত্রে বিল পরিশোধকালে মোট অঙ্কের ওপর ৩ শতাংশ হারে উৎসে কর দিতে হবে।
এছাড়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর ৩ শতাংশ উৎসে কর, ইটভাটার ওপর কর হার বৃদ্ধি, কার, জিপ বা মাইক্রোবাসের রেজিস্ট্রেশনে কিংবা ফিটনেস নবায়নকালে উৎসে কর হার বৃদ্ধি, ভাড়ায় চালিত যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নবায়নকালে উৎসে কর হার বাড়ানো হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বাজেট প্রক্রিয়ায় সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া উচিত। বাজেটের অর্থ বিলে যা থাকে, সেটাই মূল বিষয়। তবে অর্থ বিলের সবকিছু বাজেট বক্তৃতায় রাখা কঠিন। কারণ এমনিতে বাজেট বক্তৃতা অনেক বড়। তার পর সবকিছু আনতে গেলে আরো বড় হয়ে যাবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, কয়েক বছর ধরে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় জাতির সামনে অনেক প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলেন। আবার অর্থ বিলে নতুন নতুন করারোপের কথা বলেন। অনেক সময় বাজেটের পর প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন করে করারোপ করা হয়। এবারের বাজেটেও অর্থ বিলে অনেক কিছু রয়েছে, যা বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়নি। এতে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। পুরো বাজেট প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ হওয়া উচিত।
এদিকে শুধু বোতলজাত খাওয়ার পানির উৎপাদক নন; বেশ কিছু পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক ও সেবা প্রদানকারীর ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে কিংবা করের হার বাড়ানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। যেমন-মুঠোফোন আমদানিকারক ও অপারেটর, সোনা আমদানিকারক, মুঠোফোন অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সে, অনলাইনে বিজ্ঞাপনদাতাদের উৎসে করের আওতায় আনা হয়েছে। এখন এসব পণ্য বা সেবার মূল্য বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মুঠোফোন আমদানি করলে আমদানিকারককে ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম করও দিতে হবে। এতে আমদানিকারকের আমদানি খরচ বাড়বে, যা ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। এখন আমদানিকারককে শুধু আমদানি শুল্ক দিতে হয়।
সোনা ও রুপা আমদানিকারকের আমদানি খরচও বাড়বে। একজন আমদানিকারক যত টাকার সোনা বা রুপা আনবেন, এর ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর দিতে হবে। তবে এ দেশে ঋণপত্র খুলে সোনা বা রুপা আমদানি করা হয় না। যাত্রীর ব্যাগেজ রুলের আওতায় সোনা আমদানি করা হয়।
ব্যাগেজ রুল পরিবর্তন করে আগামী অর্থবছর থেকে ১৭ ভরির বেশি (২০০ গ্রাম) সোনা আমদানি করলে ভরিপ্রতি তিন হাজার টাকা শুল্ক দিতে হবে। সব মিলিয়ে স্থানীয় বাজারে সোনার দাম বাড়তে পারে।
বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালে বিজ্ঞাপন দিলে বিল পরিশোধের সময় উৎসে কর হিসেবে ৩ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান তার পণ্যের জন্য একটি ওয়েবপোর্টালে বিজ্ঞাপন দিল। এ জন্য ১০০ টাকার বিল পরিশোধ করার পরিবর্তে ৯৭ টাকা দেবে। বাকি তিন টাকা ওই ওয়েবপোর্টাল মালিকের অগ্রিম কর, যা কেটে রেখে বিজ্ঞাপনদাতা সরকারের কোষাগারে জমা দেবে।
এদিকে মুঠোফোন অপারেটর প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হবে। তরঙ্গ বরাদ্দের লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং ইত্যাদির বিপরীতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে থাকে মুঠোফোন অপারেটররা। এখন সেই অর্থের ১০ শতাংশ করে উৎসে কর কেটে রেখে এনবিআরে জমা দেবে বিটিআরসি। এটা ওই মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম কর, যা বছর শেষে সমন্বয় করা হবে।
এ ছাড়া ট্রাভেল এজেন্সের প্রাপ্ত কমিশনে ৩ শতাংশ উৎসে কর কাটার বিধান করা হয়েছে। অবশ্য স্থানীয় ঋণপত্র খুলে যাঁরা পণ্য কেনেন, তাঁদের উৎসে করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। আবার রপ্তানিকারকেরা নগদ সহায়তা পাওয়ার সময় আগের চেয়ে কম উৎসে কর দেবেন।
আগে ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য কেনাবেচায় ব্যবহৃত স্থানীয় ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর কেটে রাখা হতো। এনবিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, এখন থেকে পাঁচ লাখ টাকার কম মূল্যের স্থানীয় ঋণপত্র খোলা হলে কোনো উৎসে কর দিতে হবে না। তবে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ঋণপত্র খোলা হলে ৩ শতাংশ হারে উৎসে কর দিতে হবে।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান যদি স্থানীয় বাজার থেকে ১০ লাখ টাকার পণ্য কেনার জন্য ঋণপত্র খোলে, তবে ওই ঋণপত্রের বিপরীতে বিল পরিশোধের সময় মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক ৩ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রেখে এনবিআরে জমা দেবে।
আবার রপ্তানিকারকেরা রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা পান, সেখানেও উৎসে কর কমানো হয়েছে। এখন থেকে ১০০ টাকা নগদ সহায়তা পেলে ৩ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হবে। আগে এ হার ছিল ৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, একদিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে এনবিআর যেমন চাপের মুখে থাকবে অন্যদিকে উৎসে করের জালে সাধারণ মানুষকেও ভোগাবে। এতে করে সরকারকে অস্বস্তির মধ্যে থাকবে হবে বিশেষ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসলে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করা চ্যলেঞ্জের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা, ২৬ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর





