কর-জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে কম, এমন দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। আবার করপোরেট করহার সবচেয়ে বেশি, এমন দেশগুলোর মধ্যেও রয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় তো বটেই, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও তা বেশি। অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ নীতির কারণে নানা উপঢৌকনের বিনিময়ে কর ফাঁকির প্রবণতা কাজ করছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। আবার যেসব খাত কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছে, করযোগ্য প্রতিষ্ঠানের আয় ওইসব খাতে অন্তর্ভুক্ত করেও কর ফাঁকি দিচ্ছেন অনেকে। এতে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশে বর্তমানে করপোরেট করহার ৩৫ শতাংশ, বিশ্বের উচ্চ করপোরেট করহারের দেশগুলোর মধ্যে যা অন্যতম। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়ই করপোরেট করহার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে করপোরেট করহার পর্যায়ক্রমে কমে এলেও দক্ষিণ এশিয়ায় কমার হার তুলনামূলক অনেক কম।
জানা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বিশ্বে করপোরেট কর কমেছে গড়ে ২০ শতাংশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় কমেছে মাত্র ১১ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে কম হারে কমেছে পাকিস্তানে। ১০ বছর আগে তাদের করপোরেট কর ছিল ৩৫ শতাংশ হারে। এখন তা হয়েছে ৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট করহার ছিল ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি বছর তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে। কমার হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ভারতে ৩৫ থেকে কমে হয়েছে ৩০ শতাংশ।
কমার পরও বর্তমানে বিশ্বে সর্বোচ্চ করপোরেট করহার বাংলাদেশে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকায় করপোরেট করহার ২৮ শতাংশ।
উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে করপোরেট কর দিতে হয় গড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে। আর সবচেয়ে কম করপোরেট করহার লেবানন ও লিথুয়ানিয়ায়। দেশ দুটিতে এ করের হার ১৫ শতাংশ। এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ চীনে এ হার ২৫ ও ইউরোপে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ১৭ শতাংশ করপোরেট করহার সিঙ্গাপুরে। এছাড়া ব্রাজিলে এ হার ২৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করপোরেট করহার না কমার প্রধান কারণ করের ভিত্তি না বাড়া। অনেক বেশি খাতকে কর অবকাশ সুবিধা প্রদান এজন্য দায়ী। কিছু করপোরেট গ্রুপ একের পর এক নতুন প্রতিষ্ঠান খুলছে আর তাদের করযোগ্য যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের আয় কর অবকাশের সুবিধা পাওয়া নতুন প্রতিষ্ঠানের আয়ে অন্তর্ভুক্ত করে তা বৈধ করে নিচ্ছে। এতে করের ভিত্তি বাড়ছে না। ফলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই করের চাপ বাড়ছে। আর সরকারের প্রতি বছর রাজস্ব আহরণের হার বাড়ানোর তাগিদ থাকায় করপোরেট করহারও কমানো যাচ্ছে না।
যোগাযোগ করা হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, যত দিন নতুন নতুন করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে করজালের আওতায় এনে করের ভিত্তি না বাড়ানো হবে, তত দিন করপোরেট করহার কমানো যাবে না।
নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি বছর অনেক খাতকে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়। বর্তমানে দেশে অবকাশ সুবিধা পাওয়া শিল্প খাতের সংখ্যা ২০। কিন্তু এ অবকাশ সুবিধার কার্যকারিতা কী, তা মূল্যায়ন করা হয় না। কর অবকাশের এ সুবিধা দেশের জিডিপিতে কী পরিমাণ অবদান রাখছে বা কত সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে, পর্যালোচনা হয় না তাও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ করপোরেট করহার করদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি কর প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর কার্যালয়ের প্রশাসনিক ও কমপ্লায়েন্স খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগ বিঘ্নিত হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, করদাতা ও কর সংগ্রহকারীদের মধ্যে এক ধরনের চোর-পুলিশ মনোভাব এখনো বিরাজমান। করদাতাদের প্রতি সাধারণ ধারণা এমন যে, তারা ফাঁকি দিচ্ছেন। এমন মনোভাব থেকেই অনেক বেশি কঠোরতা অবলম্বন করছে এনবিআর; চূড়ান্তভাবে যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। প্রক্রিয়াগত ঝামেলার কারণে ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রেও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেই কর প্রশাসনের কার্যক্রমে জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে ‘টুওয়ার্ড এ মোর বিজনেস ফ্রেন্ডলি ট্যাক্স রেজিম’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। সংস্থাটি বলছে, কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের ভাষাও অত্যন্ত জটিল। ফলে সাধারণ নাগরিক তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তারাও তা ভুলভাবে বুঝে থাকেন। এতে করদাতা ও কর কার্যালয়ের মধ্যে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। উপরন্তু এসব আইনের বিভিন্ন ধারা ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। এসআরও জারির মাধ্যমে নতুন নতুন নিয়ম চালু করা হয়। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন নিয়মটি কার্যকর, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়; চূড়ান্তভাবে যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এতে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আটকে যায়।
এ অঞ্চলের কর কার্যালয়গুলোও অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। করহার বেশি হওয়ায় করদাতারা উপঢৌকনের মাধ্যমে কর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুশি করার চেষ্টা করেন। এতে প্রাপ্য কর জমা হয় না রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।
উচ্চ করহারের পাশাপাশি করদাতা ও কর কার্যালয়ের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। এসব কারণেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ হচ্ছে না বলে জানান তারা।
এনার্জি প্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ বলেন, পারস্পরিক অনাস্থার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুই ধরনের হিসাব চালু রাখার বিষয়টি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। হয়রানি এড়াতে নতুন করদাতারা কর কার্যালয়ে যেতে চান না। ফলে বাড়ছে না করের আওতা।
সূত্র: বনিক বার্তা।
এআই





