জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেছেন, অর্থপাচার রোধে ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে অপ্রদর্শিত অর্থকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া উচিত। ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে বুধবার দুপুরে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এনবিআর সম্মেলন কক্ষে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এই প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় আগামি অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার দাবি জানায় অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনোমিকস রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)। সেই সাথে অপ্রদর্শিত অর্থ সহজ শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ, কর আদায়ে এনবিআরকে আরও শক্তিশালী হওয়াসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে সংগঠনটি। বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। ইআরএফ নেতৃবৃন্দ ও এনবিআরের বিভিন্ন বিভাগের সদস্য-কর্মকর্তারা এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো অপ্রদর্শিত অর্থকে সহজ শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এমনকি বর্তমানে অনেক দেশ এ অর্থকে বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় এখানকার বিত্তবানরা তাদের টাকা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। এ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে।
ফলে বাংলাদেশ হারাচ্ছে একদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তাই সহজ শর্তে এ অর্থকে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে টাকা পাচার রোধ হবে এবং দেশে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালে গার্মেন্টস শিল্প নির্মাণে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় এ শিল্প বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর ফলে দেশে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি ৪০ লাখ দারিদ্র্য নারীর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে প্রায় ২ কোটি মানুষের।
রাজস্ব আদায় ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে গোলাম হোসেন বলেন, এ বছর থেকে বড় পরিবর্তন আসছে আয়কর ব্যবস্থায়। এরমধ্যে ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কর্পোরেট কর কমিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে করের ন্যায় নিয়ে আসা হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে করকে নতুন আঙ্গিকে পুনঃবিন্যাস করা হবে। শুল্ক ও ভ্যাট পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের চিন্তা কমিয়ে আয়করকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে গড়ে ওঠা বড় ও মাঝারি মানের শিল্পকে করের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামি বাজেটে করারোপের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু পণ্যে কর বাড়ানো হবে। এরমধ্যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য অন্যতম। এছাড়া শহরের বাড়ি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের সঠিকভাবে করের আওতায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা করা হবে। আর ২০১৬ সাল থেকে ১৭০টি পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যে সম্পুরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে।
কর আদায়ে ও করফাঁকি রোধে এনবিআরের দুর্বলতার বিষয়ে তিনি বলেন, এনবিআর একটি বড় প্রতিষ্ঠান। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর আদায় করতে হলে যে পরিমাণ লোকবল দরকার তা এনবিআরের নেই। সঠিকভাবে কর আদায় করতে হলে প্রতিটি কর সার্কেলে কর ইন্সপেক্টর দরকার হয়। কিন্তু অধিকাংশ কর সার্কেলেই তা নেই। প্রতিটি করাঞ্চলের জন্য ২৭ জন ইন্সপেক্টর দরকার হলেও এখন রয়েছেন সাত জন করে। ফলে তাদের পক্ষে অফিসের কাজ শেষ করে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কর আদায় করা সম্ভব হয় না।
আর করফাঁকি রোধে এনবিআর কারো বিরুদ্ধে মামলা করলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন বলে জানান তিনি। যার ফলে মামলা ঝুলে থাকে দীর্ঘদিন। আর এভাবে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মামলায় ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো আটকে আছে করফাঁকি বাজদের কাছে।
বাড়িওয়ালাদের দৌরাত্ব কমানোর বিষযে ইআরএফের প্রস্তাবের বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান বলেন, এ বছর থেকেই বাড়ির ও জমির দাম অনুসারে সার্বজনীন দাম নির্ধারণ করা হবে। কোন বাড়িওয়ালা যাতে আলাদাভাবে বেশি আদায় করতে না পারে সেবিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রত্যেক বাড়িওয়ালা যাতে ব্যাংক ও ডিড ছাড়া বাড়ি ভাড়া তুলতে না পারে সে বিষযে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রত্যেকের জন্য টিআইএন বাধ্যতা মূলক করা হবে।
ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের সময়ই করের টাকা কেটে নেওয়া হবে।
এ সময় বাজেটে স্থানীয় বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব করে ইআরএফ এর সভাপতি সুলতান মাহমুদ বলেন, বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ না থাকার কারণে স্থানীয় বিনিয়োগ একেবারে কমে গেছে। কর পেতে হলে বাজেটে স্থানীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।
পিপিপি নিয়ে বাজেটে বরাদ্দ শুধু এনবিআর এর এসআরও মধ্যে ঝুলে আছে বলে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়। এটা যেন এসআরও মধ্যে ঝুলে না থেকে দৃশ্যমান হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার দরকার।
কর বৈষম্য দূর করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব করদাতার কর সনাক্তকরণ নাম্বার নেই তাদের ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। অন্যদিকে যাদের সনাক্তকরণ নাম্বার আছে তাদের ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। করের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য দূর করার প্রস্তাব করেন তিনি।
ইআরএফের সাধারণ সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে কাঁচামাল থেকে শুরু করে সব পণ্য আমদানি কমে গেছে। একই সাথে শিল্পায়ন বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ি ও সুশীল সমাজ বলছে আগামি বাজেট হবে চ্যালেঞ্জিং বাজেট।
আগামি বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সক্ষম ব্যক্তি শ্রেণীর কর হার বাড়ানো, বাড়িওয়ালাদের করের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
ইআরএফের সাবেক সভাপতি খাজা মাঈন উদ্দিন বলেন, ফাস্টফুড, মিষ্টি ও হোটেল-রেস্টুরেন্টে বাণিজ্যে বিশাল কর ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, পলিসি দূর্বলতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। নজর দেওয়া গেলে করের আওতা বাড়ানোর দরকার হবে না।
আলোচনায় ইআরএফ এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু কাওসার বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ আইনি জটিলতার কারণে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব অর্থ পাচার রোধে আইন শিথিলতা প্রয়োজন। মাত্র ২ শতাংশ জরিমানা ও সহজ শর্তারোপ করলে এসব অর্থ দেশে বিনিয়োগ হত।
বাজেটে করনেট বাড়ানোর চেয়ে যারা কর ফাঁকি দেয় তাদের কাছ থেকে পুরোপুরি কর আদায় করা গেলে বাজেট ঘাটতি অনেকটা কমবে বলে মনে করছেন আবু কাওসার।
এছাড়া তিনি বাজেটে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে আয়কর আদায়, বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর বসানো, সক্ষম ব্যক্তির করের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।
ইআরএফের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কর ফাঁকি বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। এসব ফাঁকি বন্ধ করা গেলে করের আওতা না বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি যে সব শিল্প প্রণোদনা পাওয়ার পরেও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে না, সে সব খাতে প্রণোদনা বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
[b]ঢাকা, ৩০ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর[/b]
অর্থনীতি
সহজ শর্তে কালো টাকা বিনিয়োগের পক্ষে এনবিআর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেছেন, অর্থপাচার রোধে ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে অপ্রদর্শিত অর্থকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া উচিত। ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে বুধবার দুপুরে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।





