রাজধানীতে জমে উঠেছে ঈদ বাণিজ্য। রমজানের শুরু থেকেই রাজধানীর ঈদ বাজারে খানিকটা উত্তাপ দেখা গেছে। সে কারণে বিক্রেতাদের মুখে হাসি ফুটেছে। ক্রেতা সমাগম থাকায় সকাল থেকে প্রায় গভীর রাত পর্যন্ত অনেক মার্কেট খোলা থাকছে।
শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দিন থাকায় সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটমুখী হয়ে পড়েন নগরবাসী। তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষের পদচারণায় দুপুর ১২টার মধ্যেই মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে।
রাজধানীর নামকরা মার্কেটগুলোতে দেখা যায় বেশিরভাগ দোকানে ঝুলছে ভারতীয়, পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজ। ভারতীয় সিরিয়ালের চরিত্রের নামে এগুলোর দেয়া হয়েছে বাহারি নাম। মার্কেটগুলোতে শাড়ির বেশিরভাগই হয় ইন্ডিয়ান কাতান নয়তো পাকিস্তানি সিল্ক। আছে লেহেঙ্গা ও টপসসহ অন্যান্য পোশাকও। শুধু নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রেই নয়, পুরুষদের পোশাকেও প্রাধান্য পাচ্ছে থাইল্যান্ড, জাপান ও চীন থেকে আসা সব পণ্য। তবে পুরুষদের পাঞ্জাবিতেও প্রতিবেশী দেশের প্রভাব চোখে পড়ার মতো।
রোববার সিদ্ধেশ্বরী থেকে সপরিবারে মৌচাক মার্কেটে শপিং করতে আসেন শাবানা ইয়াসমিন। তিনি বললেন, ‘আজ দুই বাচ্চার জন্য ঈদের পোশাক কিনতে এসেছি। এখানে এলে সবার জন্য সবকিছু কেনাকাটা একসঙ্গে করা যায়। এ ছাড়া যানজট এড়াতে হাতের নাগালে থাকায় ঘুরেফিরেই এ মার্কেটে আসি। তবে বিক্রেতারা ঈদ পোশাকের দাম একটু বেশি হাঁকলেও দরদাম করে কিনতে পারলে ক্রয়মূল্য সামর্থ্যরে মধ্যে রয়েছে।’
রাজধানীর নিউমার্কেট ঈদের কেনাকাটায় মানুষের উপচেপড়া ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিবারের মতো এবারো নিউমার্কেটকে ঘিরেই চলছে রাজধানীর ঈদের মূল কেনাকাটা। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত সকলেই কেনাকাটা করছেন সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে।
নিউমার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, মানুষের উপচেপড়া ভিড়। যার মধ্যে তরুণী, শিশু ও গৃহবধূদের উপস্থিতিই বেশি। দোকানিরা জানালেন রোজার শুরু থেকেই এখানে ক্রেতা আসতে থাকে। অন্যান্য মার্কেটের চেয়ে বিক্রিও হয় ভালো। দেখা যায়, দেশী-বিদেশী সবধরনের কাপড় ও তৈরি পোশাক পাওয়া যাচ্ছে নিউমার্কেটে।
বিক্রেতারা জানান, বরাবরের মতো এবারো শিশু ও মেয়েদের পোশাকে ভারতীয় ছাপ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এগুলোর চাহিদাও অনেক বেশি। ঝিলিক, আশিকি-২, রেশম কা জরি, শের খান, মন মানে না, ও মাই গড, মেনে পেয়ার কিয়া, আয়শা টাকিয়া, বিপুল, বিশাল, সোনিয়া, সানি লিওন, গঙ্গা এমনসব বাহারি নামের থ্রিপিচে ছেয়ে গেছে নিউমার্কেও প্রতিটি দোকান। এসব পোশাক পাওয়া যাবে তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে।
নিউমার্কেটের যে কোনো শাড়ির দোকানে গেলে দেখা যাবে ক্রেতার সামনে যে শাড়িগুলো তুলে ধরা হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোই ভারতীয় শাড়ি। বাংলাদেশের বেনারসি কিংবা জামদানি শাড়ির সুনাম থাকলেও ঈদের বাজারে ক্রেতারা ঝুকছেন বিচিত্র নাম আর বাহারি ডিজাইনের ভারতীয় শাড়ির দিকে। প্রায় প্রতিটি দোকানে এক হাজার থেকে এক লাখ টাকা দামে হাজারো নকশার হাজারো ভারতীয় শাড়ি রয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ বাংলাদেশের থ্রিপিচ ও শাড়ির নকশায় বৈচিত্র কম।
ডিজাইনেও নেই নতুনত্ব। ম্যাচিং সেন্টারের বিক্রয়কর্মী শাহনেওয়াজ জানান, এবার ঈদের কাপড়ের মূল আকর্ষণ লেইস লাগানো কাপড়। এছাড়া বিভিন্ন কারুকাজ করা সুতি, সিনথেটিক, ভারতীয় জরিসহ লিলেনের মাঝে পাড় লাগানো কাপড় বেশি পছন্দ করছেন ক্রেতারা। এছাড়া রয়েছে এম্ব্রয়ডারি করা কাপড়। পিওর জর্জেট, চিনন জর্জেট, সুইট হার্ট ও মসলিনের মাঝে ছোট চুমকির কাজ করা ভারতীয় কাপড়গুলো বেশ পছন্দ করছেন ক্রেতারা। আবার আছে ছোট ও বড় ফুলের প্রিন্টের চায়না ডিজিটাল লিলেন কাপড়। এসবের দাম প্রতি গজে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা।
তরুণদের জন্য রেডিমেইড জিন্স ও গাবাডিং কাপড়ের প্যান্ট বেশি চলছে। আর এ জন্য নিউমার্কেটে আছে রেভলন, ক্র্যাফট ক্যাসলের মতো অত্যাধুনিক সব শোরুম। ঈদ বাজারে তরুণদের জন্য শর্ট পাঞ্জাবি ও শর্ট শার্ট ভালো বিক্রি হচ্ছে। এসব পোশাকের দাম ৩২০ টাকা থেকে চার হাজার ৬৫০ টাকা পর্যন্ত।
রাজধানীর নিউমার্কেট শুধু রাজধানীবাসীই নয় ঢাকার বাইরে থেকেও ছুটে আসে ক্রেতারা স্বস্তির দামে ভালো জিনিসটি কিনতে। সাভার থেকে এসেছেন শারমিন সুলতানা। পেশায় স্কুল শিক্ষিকা। ঢাবির সাবেক এই ছাত্রী পুরো পরিবারের জন্য কিনেছেন কাপড়। জানালেন, ভার্সিটি লাইফে এখান থেকে কেনাকাটা করতাম। অভ্যাসটা এখনও ছাড়তে পারিনি। তাছাড়া সবধরনের কাপড় এখানে পাওয়া যায়। দামটাও থাকে সাধ্যের মধ্যে।
ঢাকায় একমাত্র বিদেশি পোশাকের পাইকারি মার্কেট পলওয়েল ও গাজী ভবনে চলছে পাইকারির সঙ্গে খুচরা বেচাকেনা। পলওয়ে রয়েছে প্রায় ৫শ’ দোকান ও গাজী ভবনে শতাধিক। গাজী ভবনের বুশরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আহমেদুল কবির জাকির জানান, ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি ভালো। আর বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে। এখানে বিকিং জিন্স প্যান্ট ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা, টিসু জিন্স প্যান্ট ১২শ’-১৪শ’ টাকা, জেএসটি জিন্স প্যান্ট ১৩শ’-১৫শ’ টাকা, গিফিনি হাফ গেঞ্জি ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা, বিভিন্ন ডিজাইনের হাফ গেঞ্জি ৯শ’ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা, বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের হাফ গেঞ্জি ৬শ’-৭৫০ টাকা, শিশুদের ফ্রক ও টপস ৭শ’-৯শ’ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দেশি পোশাকের পাইকারি মার্কেট পুরনো ঢাকার উর্দু রোডের মার্কেটও জমে উঠেছে।
এদিকে দেশি ফ্যাশন হাউসগুলো সাজানো হয়েছে শিশুদের রংবেরঙের পোশাক দিয়ে। ঈদ সামনে রেখে আড়ং কন্যাশিশুদের জন্য এনেছে ফ্রিল দেয়া পার্টি ফ্রক, হাতের জমকালো কাজ করা সালোয়ার-কামিজ, ঘাঘরাচোলি। সালোয়ার ও প্যান্টের কাজে নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। দেশি দশের ফ্যাশন হাউসগুলোতে পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবি, পাজামা, শার্ট, টি-শার্ট, ফতুয়া, লুঙ্গি পাওয়া যাচ্ছে।
ঈদে তরুণ-তরুণীদের প্রিয় রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট। সহজলভ্য, আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের সমাহার এখানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এখানেই তাদের কেনাকাটা করেন বলে জানান বিক্রেতারা।
এখানকার উল্লেখযোগ্য দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইজি, কে ক্রাফট, পোশাক পরিচ্ছদ, কাপড়-ই-বাংলা, ঢাকঢোল, নিত্য উপহার, আরশি, স্বপ্নবাজ, বাংলার মেলা, রঙ,সাদাকালো, বিবিয়ানা, লোকজ, মেঘ, প্রচ্ছদ, গোকুল, বারণ, থ্রিজি, নহলী, সুঁইসুতা, ঐশী, বৃত্ত, বিন্দু, নন্দন কুটির, আতশী, ফাতিহা, টেক্কা, বাংলার রঙ, ১৯৭১, বাঙ্গাল, নক্ষত্র, মেঠোপথ, ক্যানভাস, বসন, সারাবেলা, চরকি, ষড়ঋতু, ব্যতিক্রম, ফেরিওআলা, বানি্ন, যোগী, আইডিয়াস, সেভেন, ইজি, কানন, দেশাল, গাঁওগেরাম, ফোর ডাইমেনশন, চরকি ইত্যাদি। এসব দোকানের পণ্য তারুণ্যের পছন্দ।
আজিজ সুপার মার্কেটে এবার ছেলেদের বিভিন্ন ধরনের পাঞ্জাবি ৭৫০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকা, টি-শার্ট ১৫০ থেকে ৬৫০ টাকা, শার্ট ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা, ফতুয়া ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং জিন্সের প্যান্ট ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৬৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
মেয়েদের থ্রিপিস ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, টুপিস ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, টপস্ ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, শাড়ি ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা, সিঙ্গেল কামিজ ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা, লেডিস ব্যাগ ৫৫০ থেকে ৬৮০ টাকা, ওড়না ৩৫০ টাকা, সালোয়ার ৪০০ টাকা, চুড়ি জোড়া ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাচ্চাদের ফতুয়া ২৫০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
এখানে তাঁতের শাড়ির দাম পড়বে ১২৫০-১৮৫০ টাকা। কাশ্মীরি কাতান ৫৫০০ টাকা। মনিপুরি ২৫০০-৩৫০০ টাকা। ফুল সিল্ক (এন্ডিক) ২৫০০-৪৫০০ টাকা। জামদানি ৩০০০-৪০০০ টাকা। এ ছাড়া তোষর জয়শ্রী থ্রিপিস ২৫০০-৩০০০ টাকা। সুতি থ্রিপিস ১৬৫০-৩৫০০ টাকা।
বিপুলসংখ্যক ক্রেতা সমাগমে দুপুরের পর থেকেই মার্কেটগুলোতে বেচাকেনার ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে বাচ্চা ও তরুণ-তরুণীদের তৈরি পোশাকের দোকানে বেশ বেচাকেনা লক্ষ্য করা গেছে। তবে এরই মধ্যে দেশীয় বাজার দখল করে ফেলেছে বিদেশি সব পণ্য। ফলে বিপাকে পড়েছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি শপিংমল, নিউ মার্কেট, আজিজ সুপার, সীমান্ত স্কয়ার, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, ইস্টার্ন প্লাজা, টুইন টাওয়ার শপিংমল, র্যাংগস অ্যানাম প্লাজা, রাপা প্লাজা, আলপনা প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, মৌচাক, মালিবাগ মার্কেটগুলোয় পুরোদমে চলছে ঈদের কেনাকাটা।
ঢাকা, ২০ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর





