রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, তৈরি পোশাক খাতে অরাজকতা, রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থ ছাড়, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নতুন অর্থবছরে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে সরকার। এসব চ্যলেঞ্জ নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর। এছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অর্থনীতির চাকা থমকে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
জাতীয় সংসদে রোববার ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট পাসের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। এ সময় বাজেট উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। একইসঙ্গে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমেছে স্বীকার করে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জোর দেন তিনি।
এ সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলেছেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া ছোট ছোট অনেক প্রকল্প প্রবৃদ্ধি সহায়ক হবে না।
প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করে মঙ্গলবার শুরু হয়েছে ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছর। তবে এ অর্থ বছরে মূল্যস্ফীতির কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা না হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাস হওয়া বাজেটের আকার দুই লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে এক লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৬১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঘাটতি ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে অনুদান বাদ দিলে ঘাটতি গিয়ে দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকায়। শতকরা হিসেবে যা ৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে ছয় হাজার ২০৬ কোটি টাকার অনুদান পাওয়া যাবে বলে ধরা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি অর্জন মুদ্রাস্ফীতি কমানো ছাড়াও এ অর্থবছরের বড় চ্যালেঞ্জ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। এবার অর্থবছরের প্রথম মাসেই রোজা পড়েছে। সংযমের এই মাসে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
এই বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ৮০ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। তবে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে এডিপিতে ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৮ টাকার কর্মসূচি রয়েছে। সব মিলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এডিপিতে মোট খরচ দেখানো হচ্ছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
তবে একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও শুধুমাত্র বিনিয়োগ বাড়ানোকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাজেট অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বিনিয়োগ উদ্বুদ্ধকরণ।’
তিনি বলেন, ‘সমাপ্ত অর্থবছরের (২০১৩-১৪) বড় একটা সময়জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতির প্রায় সকল খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্বক।’
‘নির্বাচন-উত্তর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে’ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘ফলে এখন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে।’
নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর রাজস্বের পরিমাণ হচ্ছে- ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। সুতরাং এ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে কি না-এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘উচ্চাভিলাষের অভাব পূর্ববর্তী ২৬ বছরে রাজস্ব আহরণ জাতীয় আয়ের হিস্যা হিসাবে মাত্র ৩ শতাংশ বেড়েছে। আমাদের বিগত পাঁচ বছরের অর্জন বিগত ২৬ বছরের অর্জনের সমান। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য আমরা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করেছি।’
অন্যদিকে, সমাপ্ত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল বাজেটের তুলনায় আকার বা মোট ব্যয় কমলেও বাজেট ঘাটতি এবং সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে। বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এটা বেড়ে ৫৯ হাজার ৫৫১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি বেড়েছে ৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা।
এদিকে নতুন অর্থবছরে (২০১৪-১৫) বাংলাদেশের অর্থনীতির পাঁচটি ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও তৈরি পোশাক খাতে অরাজকতা। এসব ঝুঁকি সামলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে পারলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে বলেও মনে করে সংস্থাটি।
তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা সক্ষম তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মে-জুন ২০১৪ এ আইএমএফের প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ওই পাঁচটি ঝুঁকি সম্পর্কে বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখিয়েছে আইএমএফ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল। তবে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে যে কোনো সময় আবারও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আর তা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে দাঁড়াবে।
একইসঙ্গে অর্থনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিদায়ক সূচক মূল্যস্ফীতির চাপকেও তা উসকে দেবে। এতে সার্বিক অর্থনীতি মারাত্দক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইএমএফের পর্যবেক্ষণ গতানুগতিক হলেও ইস্যুগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রস্তুতি কতটুকু, সেটাই দেখার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।’
ঢাকা, ৭ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // এমআর





