বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাসে অন্তত ৭ বার ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত হয়। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে চলতি জুলাই মাস যেন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি দুঃসহ সময়। গত ১০ জুলাই থেকে ইন্টারনেটের গতি কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে ১৮ জুলাই থেকে সারাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউন হয়ে গেলে যেন মাথায় বাজ পড়ে ফ্রিল্যান্সারদের।
ফ্রিল্যান্সাররা বলছেন, টানা পাচঁদিনের ইন্টারনেট শাটডাউনে তাদের দম বন্ধ অবস্থা। ফলে স্বপ্ন বাঁচাতে পাশ্ববর্তী দেশে পাড়ি জমান অনেকেই। তবে অন-অ্যারাইবাল সুবিধা থাকায় বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার নেপালে গেছেন। আবার অনেকেই ভারতেও গেছেন।
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বিএফডিসি) এর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও কয়েকজন ফ্রিল্যান্সারের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯২ জন ফ্রিল্যান্সার ভারত ও নেপালে গেছেন। তাছাড়া আরও অনেকেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত ২৩ জুলাই নেপালের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ফ্রিল্যান্সার আতিকুর। টানা সাতদিন তিনি কাঠমুন্ডুর ‘চন্দ্রগিরি হিলস’ হোটেলে অবস্থান করছেন তিনি। হোটেলের ইন্টারনেট ও সেদেশের মোবাইল সিম ব্যবহার করে সাধ্যমতো কাজ করছেন তিনি। তবে সেখানে থাকা-খাওয়া বাবদ প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বড় অংকের টাকা।
দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সিইও আল মাহমুদ জানান, ইন্টারনেট শাটডাউন হওয়ার পর তার টিমের বেশ কয়েকজন নেপাল গিয়ে কাজ করছেন। শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে এখন আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে তারা নেপাল থেকে কাজ করছেন।
মাইনুল এক্সটেনশনের মালিক ও সিইও মোহাম্মদ মাইনুল আরেফিন গেছেন দুবাই। দীর্ঘদিনের কষ্টে গড়া প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বিপুল অর্থ খরচ করে দুবাই থেকে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
কলকাতা গিয়ে নিজের এক বাংলাদেশি বন্ধুর সঙ্গে থেকে কাজ করছেন আসিফুর রহমান সোহাগ নামে এক ফ্রিল্যান্সার। সোহাগ বলেন, ‘২৪ জুলাই আমি (কলকাতা) চলে এসেছি। আমার এক বন্ধু এখানে পড়াশোনা করে। ও যেখানে থাকে, সেখানে একটি রুম এক মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছি। এখানে থেকে কাজ করছি। তুলনামূলক খরচ কম পড়লেও নিজ দেশ ছেড়ে এসে অন্য দেশে বসে কাজ করা বেশ কষ্টসাধ্য।’
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (বিএফডিএস) চেয়ারম্যান ডা. তানজিবা রহমান বলেন, ‘আমাদের অনেক ফ্রিল্যান্সার নেপালে গেছেন, অনেকে ভারতে। এখন পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেটে যে গতি পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে কাজ করা এবং ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কষ্টসাধ্য। যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের সেখাতে থেকে কাজ করতে অনেক খরচ হচ্ছে। এভাবে বেশিদিন চলতে পারবেন না কেউই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি দ্রুত ইন্টারনেট সেবা নিরবচ্ছিন্ন ও স্বাভাবিক করা হোক।’
এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ফ্রিল্যান্সাররা, তা আগামী ৬ মাসেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে ফ্রিল্যান্সারদের নগদ প্রণোদনা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) সম্মেলনকক্ষে মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সাররা যে প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট করেন, তা থেকে যে আয় আসে, তার ওপর নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়। সম্প্রতি তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিতে এই প্রণোদনাটা একটু বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমি নিজে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে কথা বলবো। তাদের নগদ প্রণোদনা যেন ৩ বা ৪ শতাংশ করা হয়, সে বিষয়ে জোর সুপারিশ করা হবে।’
তবে ফিল্যান্সাররা জানিয়েছেন, ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সাররা এখন কোনো প্রণোদনার সুবিধা পাননি।
এফএইচ





