মো. ইব্রাহীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন। সম্প্রতি কৃষিব্যাংকের অফিসার পদে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষার তারিখ এখনো পড়েনি। ইব্রাহীমের টেলিফোনে ১০ এপ্রিল একটি ফোন আসে ০১৬২৯৮৯৭৪৫৪ নাম্বার থেকে; তার নাম আব্দুল্লাহ আল মামুন। পরিচয় দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে।

ইব্রাহীমের বিশ্বাস অর্জন করতে তার ট্র্যাকিং আইডি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কথা, রোল নম্বর সবই বলেন। ইব্রাহীমও মনে করেন তিনি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির কেউ একজন হবেন। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমকর্তা পরিচয়দানকারী মামুন তার সঙ্গে ইব্রাহীমকে দেখা করতে বলেন। ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন তার কৃষি ব্যাংকের চাকরিটা পেতে সহায়তা করতে পারেন তিনি। এভাইবেই ঘটনার বর্ননা করছিলেন অভিযোগকারী ইব্রাহীম।

ইব্রাহীম বলেন, ‘১০ তারিখ আমি তার সঙ্গে দেখা করি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের রিসিপশনে বসে কথা হয়। প্রথমে ৫ লাখ টাকার কথা বললেও দরকষাকষিতে মামুন আমাকে ২ লাখ টাকায় চাকরি নিয়ে দেবেন ঠিক হয়। যে টাকার একটি চেক আগে প্রদান করতে হবে; চাকরি হলে একাউন্টে টাকা জমা দিয়ে দিতে হবে।

এরপর ইব্রাহীম তার এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাকরি করেন। ঘটনা শুনে ওই আত্মীয় ইব্রাহীমকে সাথে নিয়ে খোঁজাখুজি করে মামুনকে বের করেন। এবার দুজনকে সামনাসামনি করা হলে মামুন বলেন ‘তিনি যেটা করেছেন তা তার নিজের ইচ্ছাতে করেননি। তাকে দিয়ে করানো হয়েছে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তার ইন্ধনে।

মামুনের সঠিক পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের পাম্প অপারেটর হিসেবে কাজ করি।’ এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিতরে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেলে কিছু কর্মকর্তা এসে মামুনকে নিয়ে যান। জানা যায়, পাম্প অপারেটর মামুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী।

ইব্রাহীম অভিযোগ করেন, শুধু তাকেই নয়, কৃষি ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অলি নামের তার এক বন্ধুকেও একইভাবে ফোন করা হয়েছে।

বেশ কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিভিন্ন ব্যাংকে লোক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষা শেষে কারা যেন একটি করে টোকেনে যোগাযোগের নম্বর ধরিয়ে দিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবো। অপরাধের প্রমাণ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষার্থীদের হাতে টোকেন দিয়ে দেওয়া, ফোন করে টাকার দফারফা করার মত ঘটনা ঘটছে। তবে এভাবে কারও চাকরি দেয়ার কোন ধরণের সুযোগ নেই। কারণ, সিলেকশন কমিটি ছাড়া কোনও বিভাগেই পরীক্ষার্থীদের বিস্তারিত নথি থাকে না। একটি গ্রুপ এ ধরণের কাজ করে কয়েকদিন ধরেই চেষ্টা করছে সিলেকশন কমিটিকে সমালোচিত করার জন্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর হাত থেকে জনবল নিয়োগের ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর একটি শক্তিশালি চক্র বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির’ মাধ্যমে দেশের সবগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা। আর এ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ও নিজের স্বার্থ হাসিল করতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি গ্রুপ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, বিভিন্ন ব্যাংকে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে ফোন করে তারা টাকার বিনিময়ে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি বিভাগে কাজ করতে থাকা এক পিয়নের আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় তার নামে নোট ইস্যু করা হয়েছে। খুব দ্রুত এ পিয়নকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে প্রধান করে একটি নির্বাচক কমিটি গঠন করে সরকার সরকার। রাজনৈতিক চাপ, তদবির ও জালিয়াতি এড়িয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে যোগ্য জনবল নিয়োগের উদ্দেশ্যে ‘ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি’ গঠন করা হয়।

সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে জনবল নিয়োগে কাজ করছে এই কমিটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদাধিকারবলে এই কমিটির প্রধান। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব, সংশ্লিস্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটিতে সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

এম আর