বাংলাদেশে কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও তাদের মধ্যে মাত্র ১০ হাজার জনের বৈধ অনুমতিপত্র রয়েছে। এসব নাগরিক প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা বেতন-ভাতা পেলেও আয়কর ফাইলে খুব কম টাকা উল্লেখ করে বছরের পর বছর ধরে কর ফাঁকি দিয়ে আসছেন বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ।

এবার এসব কর ফাঁকিবাজ বিদেশিদের করের আওতায় আনতে বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব নাগরিকের কাছ থেকে কর আদায়ে আরো কঠোর হতে এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি এ রকম নির্দেশনা সম্বলিত একটি চিঠি মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে এসেছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে বাংলাদেশে

কর্মরত কোন বিদেশি নাগরিকের দেশত্যাগের আগে কর প্রদান বা আপত্তিপত্র সংশ্লিষ্ট কর অফিসে দাখিল করতে হবে।
এ বিষয়ে বিনিয়োগ বোর্ডসহ সরকারের অন্যান্য দপ্তরের সাথেও সমন্বয় করতে হবে। সেইসঙ্গে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে তাদের অধীনে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের আয়কর প্রদানে সচেতন করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, ফিলিপাইন, পাকিস্তান ছাড়াও ইউরোপের কয়েকটি দেশের নাগরিক মোটা অংকের বেতনে চাকরি করেন। দেশে অবস্থিত গার্মেন্টস, বায়িং হাউজ ও লিয়াজোঁ অফিস, ব্রাঞ্চ অফিসগুলোতে তারা চাকরি করেন।

এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, ওষুধ, বিপণন ও সেবাসহ নানা খাতেও কাজ করছেন তারা। এসব কর্মকর্তা ৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন পান। আবার কেউ কেউ আরো বেশি বেতনেও চাকরি করেন।

কিন্ত একশ্রেণির বিদেশি নাগরিক বিনিয়োগ বোর্ড এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (বেপজা) ওয়ার্ক পারমিটে বেতন অত্যন্ত কম দেখাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা সরকারের বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অফিসে কয়েক লাখ বিদেশি কর্মরত থাকলেও বৈধ অনুমতিপত্র রয়েছে মাত্র ১০ হাজারের। এমনকি অনেক বিদেশি নাগরিক আয়কর ক্লিয়ারেন্সের ভুয়া বা অস্পষ্ট ছাড়পত্র জমা দিয়ে দেশত্যাগ করছেন। আর এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অসাধু একটি চক্র সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ ধরনের বেশ কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন এনবিআরে পাঠানো হয়েছিল। একইসঙ্গে রাজস্ব ফাঁকি রোধে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এনবিআর চোয়ারম্যান গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের বড় টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় করদাতাদের কাছ থেকে কর বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশিদের কাছ থেকে রাজস্ব বাড়াতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে কর্মরত

বিদেশিদের কর ফাঁকি রোধে এবার মাঠ পর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ এখানে ফাঁকি আছে।
কেউ কেউ তিন মাসের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে তিন বছর ধরে কাজ করছেন। এছাড়াও যারা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করেন তাদের কিছু অংশ কর দিয়ে থাকেন। যাদের ওয়ার্ক পারমিট নেই তাদের কাছ থেকে কোনো করই পাওয়া যায় না।

তাই কর ফাঁকি প্রতিরোধ করাসহ অন্যদের করের আওতায় নিয়ে আসতেই এবার মাঠ পর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের অভিযানে নামানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করের আওতা বাড়াতে হলে এ বিষয়গুলোকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ আমার দেশ থেকে আয় করবেন অথচ সঠিক নিয়মে কর দেবেন না, এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাজস্ব বোর্ড ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ব্যবসায়ী এবং পর্যটকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসায় বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করেন।
এদের মধ্যে বৈধভাবে কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) আছে মাত্র ১০ হাজার বিদেশি নাগরিকের। আর দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের অধিকাংশই দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো থেকে আসা।

ঢাকা, ৪ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এমআর