অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কাঠপেন্সিল সাহিত্য সংসদ এবং ইন্টেলেকচুয়াল রিসার্চ সেন্টার (আইআরসি)। এতে দেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, গবেষক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।

স্মারক বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, লোকগবেষক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওয়াকিল আহমদ। তিনি বলেন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি লোকসংগীতকে কেবল পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, “লোকসংগীতকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এতটাই বিস্তৃত যে, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও সেই পরিসর ছুঁতে পারেনি।”

ড. ওয়াকিল আহমদ উল্লেখ করেন, আব্বাসী প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখনীতে লোকসংগীত, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজচেতনার গভীর প্রতিফলন পাওয়া যায়। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর সুমধুর কণ্ঠ যেমন শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি একজন গবেষক হিসেবে তিনি বাংলার লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় উঠে আসে তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গও। বক্তারা বলেন, আব্বাসউদ্দিন আহমদের মাধ্যমে যে লোকসংগীত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, মুস্তাফা জামান আব্বাসী সেই ধারাকে আধুনিক যুগে আরও বিস্তৃত ও জনপ্রিয় করেছেন।

তাঁর টেলিভিশন ও মঞ্চভিত্তিক পরিবেশনা নতুন প্রজন্মকে লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। একই সঙ্গে গবেষণাধর্মী কাজের মাধ্যমে তিনি লোকসংগীতকে একাডেমিক ভিত্তিও দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—সংগীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা,লেখক ও গবেষক অনুপম হায়াৎ,গীতিকার ও কবি জাকির আবু জাফর ,শিল্পী ও লেখক শারমিনী আব্বাসী ।

বক্তারা সবাই মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সঙ্গীতজীবন, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক অবদানের নানা দিক তুলে ধরে গভীর শ্রদ্ধা জানান।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইআরসি সভাপতি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন কাঠপেন্সিল সাহিত্য সংসদের সভাপতি সীমান্ত আকরাম।

সাংস্কৃতিক পর্বে আবু বকর সিদ্দিক ও ইয়াসমিন মুশতারী লোকসংগীত পরিবেশন করেন, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শরীফ বায়জীদ মাহমুদ ও সীমা ইসলাম।

অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল স্মৃতিচারণ, গান ও আলোচনার আবহ, যেখানে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কর্মজীবন নতুন করে স্মরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে রঞ্জন মল্লিক নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র “ভাওয়াইয়া শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী” প্রদর্শিত হয়। এতে তাঁর শৈশব, সংগীতজীবন, গবেষণা এবং লোকসংগীতকে জনপ্রিয় করার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লোকসংগীত চর্চা ও গবেষণার এক অনন্য ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকবে।

তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠিত এই স্মারক বক্তৃতা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলা লোকসংগীতের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এস