মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জনসচেতনতার লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানুন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।’ অর্থাৎ ডায়াবেটিস সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারলে একে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি জানিয়েছে, দেশের চারটি অসংক্রামক রোগের মধ্যে অন্যতম এই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০২৫ সালের মধ্যে দেড় কোটি ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু হয় এবং দুইজন নতুন ডায়াবেটিস রোগী শনাক্ত হয়!
আইডিএফ ডায়াবেটিস এটলাস ডায়াবেটিসের বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান এবং তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৫৩.৭ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪.৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে ৭৮.৩ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ জানেন না, তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের অধিকাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২১ সালে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯ শতাংশ।
- দেশে মহামারি রূপ নিচ্ছে ডায়াবেটিস
সোমবার (১৩ নভেম্বর) রাজধানীর শাহবাগে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে বিশ্ব ডায়বেটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে ডায়াবেটিস। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হৃদরোগের অধিক ঝুঁকিতে থাকেন। ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী তামাক ব্যবহার করলে তার ঝুঁকি পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
বক্তারা জানান, যারা তরুণ বয়সে ধূমপান করে তারা পরবর্তী সময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়া তামাক জাতীয় সামগ্রী ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জর্দা, গুল এসব থেকে দূরে থাকতে হবে।
নগরায়নের ফলে মানুষের মাঝে ডায়াবেটিস প্রবণতা বেড়ে গেছে জানিয়ে তারা বলেন, নগরায়নের ফলে হাঁটার সুযোগ কমে গেছে, খেলার জায়গা নেই। তাই ফুটপাতগুলোকে অন্তত সুন্দর করতে হবে। যাতে সেখানে হলেও মানুষ চলাচল করতে পারে।
বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ খান বলেন, ফাস্ট ফুড ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ফাস্ট ফুডের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত না। উন্নত দেশে স্কুল কলেজের আশেপাশে ফাস্ট ফুডের বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষেধ। সেখানে বাংলাদেশে স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে সব জায়গায় ফাস্ট ফুড থাকে। এছাড়া প্রত্যেকটি খাবারের গায়ে উপাদান সম্পর্কে লেখা থাকতে হবে। এতে মানুষ সচেতন থাকবে তার জন্য কোনটা ক্ষতিকর।
ডায়াবেটিস পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গ্রামের চাইতে শহরে ডায়াবেটিস বেশি। কিন্তু প্রি-ডায়াবেটিস গ্রামে বেশি। তাদের যদি শহরে আনা হয় আর আরামে থাকে তাহলেই তাদের ডায়াবেটিস হবে। ৪০ বছর বয়স থেকে ডায়াবেটিস চেকআপ করা উচিত। আর যাদের ঝুঁকি বেশি তাদের ৩০ বছর থেকে চেকআপ করা প্রয়োজন।
- প্রতিকার নেই, সচেতনতায় মিলবে মুক্তি
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকায়নে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ ও মৃত্যুর ঘটনা নিম্নতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিপরীতে বেড়েছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, কিডনি ও লিভার জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর ঘটনা। আর এসব রোগের অন্যতম প্রভাবক ডায়াবেটিস। এটি এমন একটি রোগ যা ভুক্তভোগীকে অন্য আরও অসংখ্য রোগে আক্রান্ত হতে সহায়তা করে। ফলে একে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির কারণও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মোট আক্রান্তদের ৫০ শতাংশই জানে না তারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তারা ৫-৬ বছর ডায়াবেটিস চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকেন। কারণ এই সময়ে তাদের কোনো উপসর্গ প্রকাশ পায় না। পরে কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তাদের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে তখন ডায়াবেটিস জটিল অবস্থায় চলে যায়।
এ অবস্থায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তারা জানান, ঘন ঘন প্রস্রাব, অধিক তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্তি অনুভব করা, সার্বক্ষণিক ক্ষুধা, স্বল্প সময়ে শরীরের ওজন যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘন ঘন সংক্রমণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষত যাদের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যের ডায়াবেটিস রয়েছে। একইসঙ্গে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে স্থূলতা হ্রাস, কায়িক পরিশ্রম বা নিয়মিত ব্যয়াম করা, জাঙ্ক বা ফাস্টফুড পরিহার ও ধূমপান পরিহার করতে হবে।
ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডায়াবেটিসে একবার আক্রান্ত হলে তা থেকে মুক্তির উপায় নেই। এক্ষেত্রে আশঙ্কার বিষয়- এতে আক্রান্তের হার উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে বেশি। এর প্রধান কারণ আমাদের জীবনযাপনে পদ্ধতির পরিবর্তন। বিশেষভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তন হয়েছে। হাঁটা-চলা ও কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া, ভেজাল ও ফাস্টফুড জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া, কোমল পানীয় পান, ধূমপানসহ স্থুলতা বাড়ার কারণে ডায়াবেটিস বাড়ছে। এ অবস্থায় অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ত্যাগ ও সচেতন হলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব হবে।
সচেতনতা তৈরিতে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি একটি বংশগত রোগ। ফলে কিছু লোকের ডায়াবেটিস হবেই। এ জন্য তাদের নিয়মিত ওষুধ সেবনসহ নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হবে। তবে আশার কথা হলো, টাইপ-২ ডায়াবেটিস শতকরা ৮০ ভাগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। আমরা মানুষকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। মসজিদের খুতবায় এ বিষয়ে বলার জন্য অনুরোধ করেছি। আমরা কাজীদের মাধ্যমে নবদম্পতিকে সচেতন করছি। এছাড়া গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রচারপত্র বিলি করা হচ্ছে।
মানুষ কতটা সচেতন এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আজাদ বলেন, দেশের মানুষ ডায়াবেটিসের ব্যাপারে সচেতন নয় এমনটা বলা যাবে না। মানুষ সচেতন তবে পর্যাপ্ত না। তামাক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর- এটা সকলেই জানে। ক্ষতিকর জানার পরও সিগারেট কোম্পানিগুলো কিভাবে মানুষকে এটি ভোগ করাচ্ছে? মানুষ কেন ধূমপান করছে? কারণ অবশ্যই তারা মানুষকে কোনো না কোনোভাবে এতে আকৃষ্ট করছে। আমরা মানুষকে ডায়াবেটিসের বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যেভাবে প্রচার করলে সফল হবে সেভাবে বা সে প্রক্রিয়া প্রয়োগে হয়তো সক্ষম হইনি যার মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ হবে। অর্থাৎ আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কীভাবে মানুষকে বোঝালে তারা সচেতন হবে- এটি গবেষণার বিষয়, এটি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
এনএইচ





