দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা শুক্রবার সর্বশেষ হতাহতের এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৩। এর আগে নেপালের পুলিশ জানিয়েছিল, মৃতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৮০ এবং নিখোঁজ ছিলেন ৪ হাজার ৭৯৮ জন। নতুন হিসাব অনুযায়ী, আগের তুলনায় মৃতের সংখ্যা ৭ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ২৮৫ জন বেড়েছে।

৯ দিন পর টানেল থেকে জীবিত উদ্ধার

দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও শুক্রবার উদ্ধারকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন। বন্যা ও ধসের ৯ দিন পর ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন প্রকল্পের যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ এবং যান্ত্রিক বিভাগের সুপারভাইজার কবির মহার্জন।

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) আইনপ্রণেতা ও প্রকৌশলী শ্রী রাম নেউপানে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি ২৬ আগস্ট থেকে উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

নেউপানে জানান, শুক্রবার প্রথমে সঞ্জয় সাহকে উদ্ধার করা হয়। পরে একই টানেল থেকে কবির মহার্জনকে উদ্ধার করা হয়। টানেলের ভেতরে আরও কয়েকজন আটকা পড়ে থাকতে পারেন—এমন তথ্য পাওয়ার পর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে টানেলের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাওয়ার পর উদ্ধারকারীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়। পরে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও সক্ষম হন। এতে ধারণা আরও জোরালো হয় যে, ধস ও বন্যার পরও টানেলের ভেতরে কিছু মানুষ জীবিত অবস্থায় থাকতে পারেন।

নেউপানে জানান, উদ্ধারকারী দল টানেলের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেছিল, ‘আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’ এর জবাবে ভেতর থেকে ‘ঠিক আছে’ বলে সাড়া দেওয়া হয়। এরপর উদ্ধারকারীরা নিশ্চিত হন যে টানেলের ভেতরে একাধিক ব্যক্তি আটকা পড়ে আছেন।

নতুন ভূমিধসে ফের বন্যার শঙ্কা

হিমবাহধসের প্রথম দিনেই দুটি প্রাকৃতিক হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল। ওই হ্রদগুলোর পানি উপচে পড়লে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল। পরে একটি হ্রদের পানি গত শনিবার সন্ধ্যার দিকে অনেকটাই বের হয়ে যায়। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন বিপদের সন্ধান পাওয়া যায়।

শনিবার গভীর রাতে ড্রোনের মাধ্যমে নতুন একটি বড় ভূমিধস শনাক্ত করে চীন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের দুটি হ্রদ থেকে প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে নতুন করে বড় ধরনের ভূমিধস হয়েছে। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে আরেকটি বাঁধ তৈরি হয়েছে এবং সেখানে নতুন একটি জলাধার বা হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন এই হ্রদে বিপুল পরিমাণ পানি জমা হওয়ায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় গিরং সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছাকাছি অবস্থান করা উদ্ধারকারী দল ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফলে একদিকে যখন হাজারো নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে অভিযান চলছে, অন্যদিকে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে উদ্ধারকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

চীনা বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ের বরফাবৃত অঞ্চলে এ ধরনের অস্থিতিশীলতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং বরফ ও পর্বতাঞ্চলের অস্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ ও হিমবাহের গলন এবং পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন এ ধরনের দুর্যোগকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ও ড্রোন নজরদারি এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি।

উদ্ধার অভিযানে চীনের সহায়তা

দুর্যোগ মোকাবিলায় চীন ইতোমধ্যে ২ হাজার ১০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জরুরি ত্রাণও বরাদ্দ করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত ও উদ্ধারে ভারী ড্রোন এবং অত্যাধুনিক লাইফ ডিটেক্টর যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ধসে পড়া স্থাপনা ও টানেলের মতো দুর্গম এলাকায় জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করতে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের টানেল থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, দুর্যোগের কয়েক দিন পরও ধ্বংসস্তূপ বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় জীবিত মানুষ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

স্বজনদের অপেক্ষা, উদ্ধার অভিযানে নতুন প্রত্যাশা

হাজারো মানুষের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। প্রতিদিন উদ্ধার অভিযানের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্যেই নয় দিন পর দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

তবে নতুন ভূমিধস ও সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যার কারণে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে উদ্ধারকারী দলকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ায় অভিযান পরিচালনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, নিখোঁজদের সন্ধান এবং আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

নেপাল-তিব্বতের এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা যেমন ক্রমেই বাড়ছে, তেমনি ৫ হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ থাকার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। এর মধ্যেই টানেল থেকে দুইজনকে জীবিত উদ্ধার এবং ভেতরে আরও মানুষ থাকার সম্ভাবনা উদ্ধারকারী দল ও স্বজনদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে নতুন প্রাকৃতিক হ্রদ ও ভূমিধসের কারণে বিপর্যয় আরও জটিল হয়ে ওঠায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা এবং একই সঙ্গে নতুন প্রাণহানি ঠেকানো।

বিবিসি ও এএফপি

এমএম