বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানের বার্তা সংস্থা ইয়াং জার্নালিস্টস ক্লাব (ওয়াইজেসিএনএ)-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি।
তিনি বলেন, ‘ফাদার অব অল বম্বস’ উন্মোচনের প্রস্তুতি চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রটি শত্রুপক্ষের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এটি কী ধরনের অস্ত্র, কত ওজনের, কী পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করতে পারবে কিংবা এর আঘাতের পাল্লা কত—এসব বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি মোহেবি। অস্ত্রটি প্রচলিত বড় বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র নাকি অন্য কোনো সামরিক ব্যবস্থা, তা-ও স্পষ্ট নয়।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বাড়ার দাবি ইরানের
ইরানের এই সামরিক ঘোষণার পাশাপাশি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়েও নতুন দাবি সামনে এসেছে। আইআরজিসির মুখপাত্রের ভাষ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দেড় গুণ বেড়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি।
মোহেবি আরও দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের গুণগত মান উন্নত হয়েছে। এগুলোর পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতাও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে শুধু পাল্টা জবাব দেওয়াই নয়, প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপও নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শত্রুপক্ষকে ইরানের প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা অনুভব করতে হবে।
কতটা শক্তিশালী মার্কিন ‘মাদার অব অল বম্বস’?
যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা এমওএবির আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট। প্রায় ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড বা ৯ হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এই অস্ত্রকে দেশটির সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বোমাটির বিস্ফোরণে বিস্তৃত এলাকায় শক্তিশালী চাপতরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে। বড় ধরনের প্রচলিত বিস্ফোরক অস্ত্র হিসেবে এটি সামরিক স্থাপনা, গুহা ও সুড়ঙ্গের মতো লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পরিচিত।
২০০৩ সালে অস্ত্রটির পরীক্ষা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। পরে ২০১৭ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো এটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানে গুহা ও সুড়ঙ্গের একটি নেটওয়ার্ক লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
আফগান কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় আইএসের ৩৬ জন যোদ্ধা নিহত হন। এরপর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র হিসেবে এমওএবি আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের নতুন অস্ত্র কি এমওএবির চেয়েও শক্তিশালী?
ইরানের প্রস্তাবিত ‘ফাদার অব অল বম্বস’ মার্কিন এমওএবির চেয়ে বেশি শক্তিশালী কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। অস্ত্রটির ওজন, বিস্ফোরক উপাদানের পরিমাণ, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা সম্ভাব্য ধ্বংসের পরিধি সম্পর্কে তেহরান কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
এর আগে ২০১৭ সালে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রায় ১০ টন ওজনের একটি বোমা তৈরির দাবি করেছিল। সে সময় অস্ত্রটিকে মার্কিন এমওএবির সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে আগের সেই দাবি এবং বর্তমান ঘোষণার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের জন্য অস্ত্রটির প্রযুক্তিগত বিবরণ ও পরীক্ষার তথ্য প্রয়োজন। শুধু নাম বা ওজনের ভিত্তিতে কোনো অস্ত্রের প্রকৃত ধ্বংসক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার খবরের মধ্যেই ঘোষণা
ইরানের নতুন অস্ত্র উন্মোচনের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা চলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের গত ১৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার বিষয়টিও উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ গভীর ভূগর্ভে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য অভিযানের জন্য বড় ধরনের হামলা থেকে শুরু করে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট সব বিকল্প বিবেচনায় রেখেছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন অস্ত্র উন্মোচনের ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিবেদন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটকে আরও আলোচনায় এনেছে। তবে ‘ফাদার অব অল বম্বস’-এর প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত একে মার্কিন এমওএবির চেয়ে শক্তিশালী বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্র: আনাদোলু, রয়টার্স ও সিএনএন
মার্কিন ‘মাদার অব অল বম্বস’-এর জবাবে ‘ফাদার অব অল বম্বস’ আনছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বম্বস’-এর আদলে ‘ফাদার অব অল বম্বস’ নামে নতুন একটি অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। তবে অস্ত্রটির প্রকৃত সক্ষমতা, গঠন কিংবা ধ্বংসক্ষমতা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি তেহরান। ফলে নতুন এই অস্ত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
এস















