কোথাও মেরামতে কয়েক মাস লাগছে, কোথাও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতির পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির তুলনায় অনেক দুর্বল অবস্থানে থেকেও ইরান কীভাবে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, এসব হামলা তার একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশে অন্তত ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় ১৩৫টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন। এসব হামলার কয়েকটি চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বাহিনী ও তেহরানের নিয়ন্ত্রণাধীন ইরাকি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বেড়েছে তেলের দাম। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেশটিকে তার প্রতিবেশীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও তেহরানের প্রভাব বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও দর-কষাকষিতেও এ পরিস্থিতি ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
রয়টার্স বলছে, যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এসব হামলার কথা জানালেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। এগুলো অচল হয়ে পড়ায় পুরো স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কোথাও একটি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থায় একের পর এক সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কিছু লক্ষ্যবস্তু ভবনের ছাদ বা রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য তৈরি আচ্ছাদনের নিচে থাকায় মহাকাশ থেকে সহজে দেখা যায় না। কোনো কোনো লক্ষ্যবস্তুর বিস্তৃতি মাত্র কয়েক মিটার। আবার কিছু সরঞ্জামের গুরুত্ব বোঝার জন্য তেল পরিশোধন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কিংবা ধাতু গলানোর মতো বিশেষায়িত বিষয়ে জ্ঞান প্রয়োজন।
রয়টার্স জানিয়েছে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে না পারায় সব ক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বারবার দেখা গেছে, ইরানের হামলা ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং যেসব সরঞ্জামে আঘাত করা হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের সাবেক বিশেষ অভিযানবিষয়ক বিমান হামলা সমন্বয়কারী রায়ান স্টিভেনস। তাঁর মতে, এসব হামলায় ইরানের নিখুঁত নিশানা, লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জ্ঞান এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। দেশটি ইরানের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর সক্ষমতাকেও বারবার খাটো করে দেখিয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সরকার প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন আকাশে প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরানের হুমকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।
তার ভাষ্য, গত সাত মাসে দশের অধিক প্রতিবেশী দেশ এবং শত শত বাণিজ্যিক জাহাজকে নির্বিচার লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ইরানের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের মিশন, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে, রয়টার্সের বিস্তারিত মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান আবারও প্রমাণ করেছে, বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও দেশটি টিকে থাকতে পারছে। এর আগে রয়টার্সের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অবৈধ আয় সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান কীভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময়ব্যবস্থা ও অবৈধ জুয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধের মধ্যে দমন-পীড়ন বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো কোনো স্থাপনায় প্রায় প্রতিদিন হামলা হয়েছে। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের মেরামত ব্যয় ও রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম গলনাগার এক দিনেই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরা বন্দর। হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত এই বন্দর দিয়ে হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলে ফুজাইরা বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফুজাইরা বন্দরে অন্তত ১৯ বার হামলা চালিয়েছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এসব হামলায় বন্দরের কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অচল হয়ে পড়ে।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ফুজাইরা বন্দরের কাছে একটি সড়ক থেকে হামলার দৃশ্য দেখেছিলেন এক বিদেশি ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমরা ড্রোনগুলোকে আসতে দেখছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টাও দেখেছি।’ রয়টার্সের পর্যালোচনা করা হামলার ছবির সঙ্গে তাঁর বর্ণনার মিল পাওয়া গেছে। ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘তারা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠাচ্ছিল। এর মধ্যে একটি বা দুটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়েছিল।’
এই অনুসন্ধানের জন্য রয়টার্স অবকাঠামোগত হামলা সম্পর্কে জানেন—এমন ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। হামলার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছে। সরকারি বিবৃতি এবং রাডার, দৃশ্যমান আলো ও আবহাওয়াবিষয়ক উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলার সময় ও ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করেছে। প্রকাশের আগে অনুসন্ধানের ফলাফল হামলার শিকার স্থাপনাগুলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছেও পাঠানো হয়।
রয়টার্সের হিসাবে, হামলার পর অন্তত ৩৪টি সরকারি বিবৃতিতে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছেই অবস্থান করছে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনস উপগ্রহচিত্রে ফুজাইরা বন্দরের প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানের বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বলেছে, ‘ইতিহাস দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা প্রায়ই এ অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে যায় এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।’ সরকার আরো বলেছে, বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে উত্তেজনা কমানোর নতুন উদ্যোগ জরুরি।
উপসাগরীয় দেশগুলো হামলার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্যও সীমিত রাখছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবে হামলার পর নির্দিষ্ট ধরনের ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং ছড়িয়ে দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। এসব দেশে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন ব্যবহার করেও হামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ সীমিত করা হয়। তবে যুদ্ধ চলাকালে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হামলার দৃশ্যের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে।
তেলবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফরেন রিপোর্টসের প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ রিড বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নকে এমনভাবে বিবেচনা করছে, যেন তা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য সীমিত রেখেছে। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়েছে কেবল বাহরাইন সরকার। তাদের বক্তব্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তদন্তের স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা বজায় রাখা এবং হামলার পরের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে যাতে নতুন হামলার পরিকল্পনা করা না যায়, সে জন্য এসব বিধিনিষেধ রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় হামলার পাশাপাশি ইরান সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শক কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর শত শত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক ডজন উড়োজাহাজও।
রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল ও ছবি পর্যালোচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ১১ জন অভিজ্ঞ ব্যক্তি, সাবেক মার্কিন সেনা স্টিভেনস, নিরাপত্তা খাতে কর্মরত আরেক সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য এবং সন্ত্রাসবাদ দমন ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে অভিজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাঁদের ১৪ জনের সবাই বলেছেন, কয়েক ডজন বড় অবকাঠামোগত স্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি মূলত আকাশ থেকে এলোমেলোভাবে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষের কারণে হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা অত্যন্ত অসম্ভাব্য। তাঁদের অনেকে বিস্ফোরণের দৃশ্যমান চিহ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। শুধু ধাতব কোনো বস্তু আঘাত করার মতো ক্ষতি নয়, বরং লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্বও তাঁদের এই মূল্যায়নের ভিত্তি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এমন একটি শান্তিচুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাঁদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের যুবরাজ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে। সৌদি আরবের দাবি, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলা চালিয়েছে। এর চেয়েও বড় প্রভাব ফেলেছে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় ইরানের হামলা। এতে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
মার্চে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি বলেছিলেন, ইরানের দুটি হামলায় ধ্বংস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি স্থাপনার কোল্ড বক্স পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত চারটি অবকাঠামোগত স্থাপনা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে প্রায় এক বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। রাস লাফান এলএনজি স্থাপনা ছাড়াও রয়েছে কাতারের পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস শোধনাগার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স এবং আল তাওয়েলা অ্যালুমিনিয়াম গলনাগার। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিবৃতি ও জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আইআইআর এনার্জির মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) প্রধান নির্বাহী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী সুলতান আল জাবের মে মাসে আটলান্টিক কাউন্সিলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুই ছিল বেসামরিক—বিমানবন্দর, টার্মিনাল, শোধনাগার, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা, বিপণিবিতান এবং সবশেষে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।’
তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আমাদের জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানছে।’ কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের সরকার এবং এডিএনওসি রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ফুজাইরা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। সে বছরই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি গোপন মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, নিজেদের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করলে ইরান কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ‘বেছে নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলাই উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।’
যুদ্ধের প্রথম দুই মাসে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে ফুজাইরা বন্দর। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম তিন মাসে বন্দরটি কখনো হামলার শিকার হয়েছে, কখনো মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিল। ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলার খবর জানানো হয় ৩ মার্চ। দুই দিন পরও উপগ্রহচিত্রে তেলের ট্যাংকগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। দুটি তেল সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
৯ মার্চ দ্বিতীয় হামলার খবর জানানো হয়। এতে শুধু জ্বালানি পণ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, বন্দরের প্রথম ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডটিও ধ্বংস হয়েছে। ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি জাহাজে তোলার স্থানে নেওয়া হয়।
আমিরাতের কর্মকর্তারা প্রথম দুটি হামলার ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছিলেন। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল পর্যালোচনা করা ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি বলেন, ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ পড়ে গিয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন স্থানান্তরব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এ ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এটি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাতের মতো।’
১৪, ১৬ ও ১৭ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে আরও হামলা হয়। এসব হামলা শুরু হয়েছিল ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি টার্মিনালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর। রয়টার্সের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ, চারজন বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা এবং ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানেন এমন একজনের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার একটিতে বন্দরের দ্বিতীয় ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দ্বিতীয় ম্যানিফোল্ডের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আগে প্রকাশিত হয়নি। তবে এর ফলে ফুজাইরা বন্দরে তেল ওঠানোর কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছিল, তা বোঝা যায়। জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ শুরু হওয়া সপ্তাহে বন্দরটি থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ কমে ৪ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বন্দরটির দৈনিক গড় রপ্তানির তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম।
যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহমূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার বা তারও বেশি হয়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আগের দিনের ব্রেন্টের সমাপনী মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলার বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক নীতির সাবেক উপসহকারী মন্ত্রী থমাস ওয়ারিক বলেন, ইরানের কাছে তেলশিল্প সম্পর্কে জানেন এমন অনেক লোক রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে তা নিক্ষেপ করতে জানেন, এমন লোকও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ছিল ইরানের। এর মধ্যে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রও ছিল, যা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা কঠিন। পাশাপাশি ইরানের ড্রোনশিল্পও বেশ উন্নত। যুদ্ধের আগে দেশটি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরিতে সক্ষম ছিল। এর মধ্যে বিস্ফোরকবাহী শাহেদ ড্রোন ছিল অন্যতম প্রধান।
২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর অন্তত ছয়টি সরকারি বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ইরানের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী করেছে। কোনো বিবৃতিতেই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হয়নি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র হকিন্স বলেন, ‘ইরানের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আঞ্চলিক অংশীদারদের পাশে ছিল এবং এখনো রয়েছে। সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার হামলাকারী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।’
মার্চের মাঝামাঝি হামলার পর ফুজাইরা বন্দরে মেরামতকাজ শুরু হয়। উপগ্রহচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর কাছে ক্রেন দেখা যায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে বন্দরটির সাপ্তাহিক রপ্তানি বেড়ে দৈনিক হিসাবে ৩২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। ২০১৩ সালে বন্দরটির তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ রেকর্ড।
কিন্তু এরপরও হামলা বন্ধ হয়নি। রয়টার্সের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ এবং ওয়ারিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ৬ এপ্রিলের হামলায় এডিএনওসির তেল পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম রাখা একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর ৪ মে ড্রোন হামলায় প্রথম ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের সঙ্গে যুক্ত একগুচ্ছ পাইপ ভেঙে যায়। মার্চে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এই ব্যবস্থার ওপর হামলার ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথটি আবারও আগুনে জ্বলে ওঠে।
তবে আরও বড় সমস্যা তৈরি হয় পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হামলার দিন থেকে ১ জুন পর্যন্ত ফুজাইরা বন্দর থেকে মাত্র একটি জাহাজে পণ্য পাঠানো হয়েছিল। পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগে।
৪ মে হামলার কথা স্বীকার করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরপর ১৭ মে ইরান আবার দেশটির বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্তত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে।
জুনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আটকে থাকা ইরানের অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড় করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়েছিল। ওই সূত্রগুলোর দুজন বলেছিলেন, এর বিনিময়ে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছিল।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘ইরানের কোনো জব্দ করা অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে ছাড় করা, স্থানান্তর করা বা স্থানান্তরে সহায়তা করা হয়নি।’
আগস্টে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তাঁর দাবি, এর সঙ্গে আমিরাতে হামলা বন্ধের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের আচরণ সংশোধনের’ ফল।
১৭ মে-র পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবকাঠামোয় নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে সেপ্টেম্বরে সমুদ্রে এডিএনওসির তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলার মধ্যেই ফুজাইরা বন্দর থেকে মোট রপ্তানি দৈনিক হিসাবে রেকর্ড ২৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছায়। তখন অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি দুই ধরনের পণ্যই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে পরিবহন করা হচ্ছিল।
ইরানের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশাধিকার রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছবি ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে ইরান। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন তিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের একজন ইরানের এবং দুজন উপসাগরীয় অঞ্চলের।
তথ্য আদান-প্রদান সম্পর্কে জানতে চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ‘আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ধারাবাহিকভাবে ও কঠোরভাবে পালন করে’। রাশিয়া এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ওই তিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা এবং সেখানে হামলার শিকার বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রটির অবস্থান সম্পর্কেও ইরানের কাছে তথ্য ছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাবি, ১৭ মে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানা ড্রোনটি ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাঠানো তিনটি ড্রোনের একটি ছিল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
রয়টার্সের হাতে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো স্পষ্ট উপগ্রহচিত্রটি ধারণ করা হয়েছিল ১৬ জুন। এতে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থাকা একটি ভবনের ছাদে দুটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবনটি একটি চুল্লি থেকে প্রায় ১৩০ মিটার দূরে অবস্থিত।
আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, এ হামলা থেকে বোঝা যায়, হামলাকারীদের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল। ২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় তিনি বলেন, ‘এর অর্থ, যারা হামলার পেছনে ছিল বা আছে, তারা ঠিক কী করছে, তা ভালোভাবেই জানত।’
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী এমিরেটস নিউক্লিয়ার এনার্জি করপোরেশন ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেনি। তবে সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্ধারিত কার্যপ্রণালি যথাযথভাবে কাজ করেছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বজায় ছিল। কেউ আহত হননি, তেজস্ক্রিয় পদার্থও ছড়ায়নি। বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক ছিল এবং জনসাধারণ বা পরিবেশের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। আইএইএ এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কুয়েতের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে যথেষ্ট হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পরপরই দেশটির জ্বালানি রপ্তানির অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরান। কুয়েত সিটির প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে আহমাদি গভর্নরেটের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। এ এলাকায় রয়েছে মিনা আল-আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগার, শুয়াইবা বন্দর এবং শুয়াইবা বিদ্যুৎ ও পানিশোধনকেন্দ্র।
যুদ্ধের প্রথম দিন শুয়াইবা বন্দরের কাছে ধ্বংসাবশেষ পড়ে যাওয়ার পর কুয়েত বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তিন সপ্তাহের মধ্যে পাশের মিনা আল-আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগারেও হামলা হয়।
ট্যাংকারের চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে কুয়েত এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলও রপ্তানি করতে পারেনি। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাওয়েলা অ্যালুমিনিয়াম গলনাগারেও হামলা চালানো হয়। অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে বিশ্বের নয়টি গলনাগারে ৪২ বছর কাজ করা এবং এডিএনওসির ওই স্থাপনা পরিদর্শন করা বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক ডেভিস রয়টার্সের পাওয়া উপগ্রহচিত্র পর্যালোচনা করে জানান, হামলায় স্থাপনাটির বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তিনটি গলন-উৎপাদন লাইনের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি লাইনে শত শত পাত্রে অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে তরল ধাতু তৈরি করা হয়।
ডেভিসের মতে, একটি উৎপাদন লাইনে হামলা হলে বাকি দুটি লাইন সচল থাকতে পারত। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এটা সত্যিই দুঃখজনক। এটি অসাধারণ একটি স্থাপনা।’
এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওই গলনাগার এবং একই সপ্তাহান্তে বাহরাইনের আরেকটি গলনাগারে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতির হামলার পর বিশ্ববাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
বাহরাইন সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, বিদ্যুৎ, পানি, যাতায়াত ও মানুষের জীবিকার ওপর নির্ভরশীল স্থাপনাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। দেশটির সরকার আরও বলেছে, বাহরাইনে বসবাসকারী ও ভ্রমণকারী সবার নিরাপত্তা তাদের অগ্রাধিকার। হামলার ঘটনা ঘটলে জীবন রক্ষা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।
কুয়েতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহব্যবস্থায় হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্চে প্রথম প্রকাশ্যে ইরানের পানির সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লোর মতে, শেষ পর্যন্ত ইরানই প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে সেই হুমকিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
মরুভূমির দেশ কুয়েত পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য পানিশোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে পানযোগ্য করতে বিপুল তাপ ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক পানিশোধনাগার উপকূলীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২ মার্চ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে কুয়েতের আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানিশোধনকেন্দ্রের অন্তত চারটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। কোনো কোনো স্থাপনায় একাধিকবার হামলা হয়েছে। জুলাইয়ে টানা চার দিনের একটি সময়ে কুয়েত সরকার যেসব স্থাপনাকে ‘বেশ কয়েকটি’ পানিশোধনাগার বলে উল্লেখ করেছিল, সেগুলোর ওপর হামলা হয়। এর মধ্যে একটি স্থাপনায় ওই অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত দুবার আঘাত হানা হয়।
উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ শুয়াইবার বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলে অন্তত ১৩টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
লো বলেন, পানিশোধনাগার ছাড়া কুয়েতের টিকে থাকার মতো প্রাকৃতিক পানির উৎস নেই। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যদি তাদের পানিশোধন সক্ষমতার যথেষ্ট অংশে হামলা করেন, তাহলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের পানির সংকট দেখা দিতে পারে।’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুয়েত সরকার নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানায়। এ জন্য ‘যৌথ দায়িত্ববোধের চেতনায়’ সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়।
জ্বালানি স্থাপনার বাইরে বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষভাবে বেশি হামলা হয়েছে। হুথিদের দায়ী করা একটি হামলায় শনিবার সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২ জন নিহত হন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটিই ছিল এসব হামলার মধ্যে প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা।
কুয়েতের বিমানবন্দরে আটবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা হয়েছিল আগের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল মেরামত করে পুনরায় চালুর মাত্র দুই দিন পর।
ডিজিটাল অবকাঠামোও হামলা থেকে রেহাই পায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজনের তথ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা সম্ভব না হওয়ায় বাহরাইনে ছয় মাস পরও সেবা বন্ধ ছিল। রয়টার্সের অনুসন্ধান সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করেনি অ্যামাজন। তবে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ‘আঞ্চলিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে’।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাওয়েলা গলনাগারে হামলায় মোট ১ হাজার ২৬২টি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হামলার দুই মাস পর প্রথম সেলটি আবার চালু করা সম্ভব হয়। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ মোট সেলের মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা গিয়েছিল। উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোও ধারাবাহিক হামলার মুখে পড়েছে। দেশটির তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা কূপ থেকে শুরু হয়ে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন, শোধনাগার ও বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি অংশই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। কয়েক দশক ধরে এ দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে ১৯৮৩ সালের সিআইএ মূল্যায়নও রয়েছে।
সৌদি আরব বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশ উৎপাদন করে। দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালও উৎপাদন করে। তাদের তেল রপ্তানির প্রায় পুরোটাই দুটি প্রধান বন্দরের মাধ্যমে হয়। সাধারণত সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি হয় পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত রাস তানুরা বন্দর দিয়ে। বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত কিং ফাহদ শিল্পবন্দর থেকেও তেল রপ্তানি করা যায়।
যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর এবং সেখানে তেল পৌঁছানোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। তবে লোহিত সাগরের এ বন্দর থেকে যাত্রা করা অধিকাংশ জাহাজকে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং সংকীর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।
শিল্প খাতের দুটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চ ও এপ্রিলে ইরান সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরে অন্তত দুবার ড্রোন হামলা হয়।
আইআইআর এনার্জির জ্বালানি গোয়েন্দা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলারি স্টিভেনসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ মার্চ ড্রোন হামলায় সৌদি আরামকো মোবিল রিফাইনারি লিমিটেডের ইয়ানবু শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শোধনাগারটির উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশে সীমিত ছিল। ওই সময়ের কাছাকাছি ধারণ করা উপগ্রহচিত্রে ইয়ানবুতে আগুনে পোড়া দাগ দেখা গেলেও শোধনাগারের ঠিক কোন অংশে আঘাত লেগেছিল, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে লোহিত সাগর এলাকায় হামলা কমে আসে। কিন্তু ১৩ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরঞ্জাম নিয়ে ইয়েমেনে যান বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।
এর পরদিন ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেন। রয়টার্সের দৃশ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোর অন্তত তিনটি সেতু ও একটি সুড়ঙ্গে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বন্দর আব্বাস ইরানের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর।
এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবে হামলা চালায়। সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো তখন ব্যাপকভাবে হামলার শিকার হয়। ইরান অবশ্য হুথিদের কর্মকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেছে। হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুথিরা। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেননি হুথি মুখপাত্র।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৫ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইয়েমেন সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত জাজান শোধনাগারে অন্তত চারবার হামলা হয়। প্রথম হামলায় শোধনাগারের ট্যাংক সংরক্ষণ এলাকা এবং পাশের ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কমপ্লেক্সে তেলকে গ্যাসে রূপান্তর করে শোধনাগারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
স্টিভেনসন ও আরামকোর কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন এমন দুজনের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর জাজান শোধনাগারের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কেপলারের তথ্য বলছে, ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে শোধনাগারটি থেকে মাত্র একটি জাহাজে পণ্য তোলা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং প্রধান তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আরামকোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় সৌদি আরবের দৈনিক তেল উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে ছিল। যুদ্ধের আগে তা ছিল এক কোটিরও বেশি ব্যারেল। বর্তমান দামে এই উৎপাদন হ্রাসের কারণে দেশটির ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব হারানোর হিসাব পাওয়া যায়।
এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় পশ্চিমা জ্বালানি কোম্পানিগুলো যৌথ উদ্যোগে সৌদি আরবে বিভিন্ন স্থাপনা পরিচালনা করে। হামলার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি ডলার। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি আরামকো, এক্সনমোবিল ও শেল।
৭ সেপ্টেম্বর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হামলার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘বিষয়টি সহজ: তেল ও গ্যাস উৎপাদনের শৃঙ্খল বিস্তৃত, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব এবং তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব জলসীমা ও স্থাপনায় থাকা মার্কিন তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোও একই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
এর তিন দিন পর সৌদি মরুভূমিতে তিনটি পাম্পিং স্টেশনে আকাশপথে হামলা হয়। এর একটিতে ভয়াবহ আগুন লেগে সেটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ফলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
এ হামলায় হরমুজ প্রণালির বিকল্প আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথও বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ইরানের অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে দেশটিকে দুর্বল করার যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখার প্রচেষ্টাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
রয়টার্স
এমএম
















