কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ শুক্রবার বলেন, শনিবার প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। গত সপ্তাহের শনিবারের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বেশি।

ম্যাক্রোঁর সরকার সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠকের পর আরও কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ অভিযোগ করেন, উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে সরকারি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি বলেন, সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত সপ্তাহে সংবেদনশীল কয়েকটি এলাকায় যে কারফিউ জারি করা হয়েছিল, তা বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।

বিভিন্ন শহরে বিধিনিষেধ

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জনসমাগম ও গণপরিবহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসে রাতের কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁর কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে শনিবারের জন্য কারফিউ ও গণপরিবহনে বিধিনিষেধও জারি করা হয়েছে।

উপকূলীয় শহর মার্সেইতে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলেও বিশেষ বিবেচনায় শ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিলের অনুমতি দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার শুধু শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। তাদের অভিযোগ, সরকার বিক্ষোভের স্বাধীনতা সীমিত করছে।

গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনটির একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকেও সমাধান মেলেনি

শুক্রবার প্রথমবারের মতো হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। শিক্ষার্থী সংগঠন ‘হাইস্কুল রিনিউয়াল’-এর সভাপতি নাথানায়েল কম্বারি জানান, প্রেসিডেন্ট তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

কম্বারি বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়ার এবং আন্দোলনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

এদিকে ফ্রান্সের জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ বিধিনিষেধের মধ্যেও শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনও প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে পদযাত্রার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ প্যারিসে শ্রমিক ইউনিয়নকে নির্দিষ্ট পথে বিক্ষোভের অনুমতি দিলেও ইউএনইএফ ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমাবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইউএনইএফ জানিয়েছে, তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিধিনিষেধকে কর্তৃত্ববাদী আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, এসব পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে বিপন্ন করতে পারে।

অন্যদিকে, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের গুরুতর আহত হওয়ার খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

ফরাসি শ্রমিক সংগঠন ডেমোক্রেটিক কনফেডারেশন অব লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারিলিস লিওঁর মতে, জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

ইউএনইএফের অভিযোগ, ম্যাক্রোঁ সরকার বিক্ষোভের স্বাধীনতা খর্ব করছে এবং প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ করছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনেও প্রভাব

নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও লুই ভুইতোঁ ফাউন্ডেশন বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া প্যারিসে আয়োজিত ‘আর্ট বাসেল’ মেলা নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে শুক্রবার শেষ হয়েছে।

ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স

এস