বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বিশেষ করে নৌবাহিনীর সক্ষমতা সরেজমিন যাচাই করতেই মূলত ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহার পার্রিকার দু’দিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

গত ১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে চীনের তৈরি দু’টি সাবমেরিন আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের সামরিক অঙ্গনে চীনের প্রভাব নিয়ে ভারতের শঙ্কা চরমে পৌঁছায়। ‘নবযাত্রা’ও ‘জয়যাত্রা’নামের সাবমেরিন দু’টি  আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক শক্তি হিসেবে যাত্রা শুরু করল এই ০৩৫জি সিরিজের সাবমেরিন দু’টি সংগ্রহের মাধ্যমে । ডুবোজাহাজ দু’টির প্রতিটির দৈর্ঘ্যে ৭৬ মিটার ও প্রস্থে ৭ দশমিক ৬ মিটার। এগুলো টর্পেডো ও মাইন দ্বারা সুসজ্জিত, যা শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজে আক্রমণ করতে সক্ষম।

নানা কারণে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের শক্তি বৃদ্ধি পাক এটা ভারত চায় না। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারতের হাজার হাজার মাছ ধরার বড় বড় ট্রলার প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে ঢুকে ইলিশ মাছসহ সামুদ্রিক মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জেলেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভোলার কাছাকাছি পর্যন্ত ভারতীয় মাছ ধরার ট্রলারগুলো চলে আসে। ভারতীয় সিক্স স্যালেন্ডারযুক্ত ট্রলারগুলো আকারে অনেক বড়, প্রতিটি ট্রলারে মাঝিদের কাছে ওয়ারলেস থাকে। ভারতীয় এই ট্রলারগুলোর গঠনও বাংলাদেশি ট্রলার থেকে কিছুটা ভিন্ন।

বাংলাদেশি মাঝিদের অভিযোগ, দেশের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী রহস্যজনক কারণে ভারতীয় ট্রলারগুলোকে কিছু বলে না। বাংলাদেশের মাঝিরা কিছু বলতে গেলে ভারতীয়রা ওয়ারলেসে একে অপরকে ডেকে সব ট্রলার এক জায়গায় জড়ো হয়ে যায়। এমনকি ভারতীয় বড় সাইজের ট্রলারগুলো এতটাই আগ্রাসী যে অনেক সময় বাংলাদেশি ট্রালারের ওপর আঘাত করে। এতে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশি ট্রলার ডোবার খবরও শোনা যায়। বরগুনা জেলার পাথরঘাটার ছগির কোম্পানির একটি ট্রলার এভাবে ডুবিয়ে দেয়া নিয়ে অনেক তোলপাড় সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। ওই ট্রলারের ড্রাইভার ইছা মিস্ত্রি ওই ঘটনায় মারা যান।

ভারতের ওই ট্রলারগুলো ৮০ হাত গভীর কটের জাল, ৪০ হাত গভীর ড্যাশন জাল এবং ট্রলি জাল নিয়ে এভাবে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে কোটি কোটি টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। এমনকি ভারতীয় বরশির ট্রলারগুলোও এভাবে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার  ভেতরে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এমনটি হবার কথা নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেয়া হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের একধিক সূত্রে জানা গেছে, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে চীনের মোকাবেলায় ভারতকে টিকে থাকতে হলে বঙ্গোপসাগরে ভারত তার শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায়। পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরে ভারত অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি ভারত কিছুতেই চায় না সাগরে বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বাড়ুক। আর সেটা যদি আবার চীনের সহায়তায় হয় তা কিছুতেই ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এটাই স্বাভাবিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, চীনের সাবমেরিন দুটো বাংলাদেশ নৌবহরে যুক্ত হলে তাতে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং ভারতের খবরদারির পথে তা কতটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করতেই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দু’দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র আরো জানায়, তবে এতে বাংলাদেশের খুব একটা সমস্যা নেই। কারণ সাবমেরিন দুটো যথাযথভাবে নৌবহরে যুক্ত হলে যে সামরিক শক্তি বাড়বে তা তো আর ভারত খর্ব করতে পারবে না। আর এটা তো কোন গোপন বিষয় নয়।

এদিকে, ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী যৌথ-সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণের যে প্রস্তাব বাংলাদেশকে দিয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ওই সূত্র জানায়, ভারত চায় বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে চীনের প্রভাব না বাড়ুক এবং ভারতীয় প্রভাব যেন খর্ব না হয়। আর সে লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব।

পাশাপাশি যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর শক্তি ও মনোবল এবং কলা-কৌশল প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কেও ভারত একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারবে বলে বিশ্বাস দেশটির।  ভারতীয় মন্ত্রী ও হাই-কমিশনার এই ঢাকা সফরের সাথে বাংলাদেশের বিজয়ের মাসকে জড়িয়ে এবং একাত্তরে ভারতের সহায়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘ইমোশোনাল ডিপ্লোমেসি’করছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) সাবেক মহাপরিচালক ও সামরিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম ফজলুর রহমান বলেন, ভারতের আগ্রাসী নীতির কারণে এদেশের সিংহভাগ মানুষ ভারতবিরোধী। তারা কখনই ভারতকে বন্ধু মনে করে না। অপরদিকে, ভারতেরও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তার প্রতিবেশীরা তার শত্রু। তাই ভারত কখনই বাংলাদেশকে বন্ধু মনে করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারতকে অবশ্যই কিছু বিষয়ে নমনীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে, মাঝে মধ্যেই সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশী হত্যার শিকার হন। এটা বন্ধ করতে হবে। তবে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে গরু চোলাচালান বন্ধ করতে হবে বলেও মনে করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ।

সুত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ( souhasianmonitor)

এআই