অবশেষে সকল উদ্বেগ, উৎকন্ঠা আর প্রতিবাদের মুখে হোয়াইট হাউজের একটি ভাষণে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি আমেরিকান দূতাবাস তেল আভিভ থেকে জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের আগে ক্রমান্বয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল ফিলিস্তিন। কারণ এর আগে জেরুসালেমকে রাজধানী হিসেবে একমাত্র দাবি রাখত তারা।

ইসরাইল-ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে আমেরিকার দুই রাষ্ট্রের সমাধান নীতিতে একরাষ্ট্রকে একাগ্রতার সহিত প্রাধান্য দেয়ায় সমালোচনার ঝড় তুলেছে বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্ব নেতাদের কাছে।

অনেক বিশ্বনেতাদের মতে এই ঘোষণা ট্রাম্পের উগ্রতা দেখায় ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব প্রকাশ করে। তারা ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ধিক্কার জানান এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতিতে নতুন ভয়ানক দিক উন্মোচন হবে বলে ধারণা করছেন।

ট্রাম্পের জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পর হতাশা প্রকাশ করে লেবাননের প্রেসিডেন্ট মাইকেল আউন বলেন, এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের স্থবিরতা ও নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অপরদিকে জর্ডান, ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, এই ঘোষণা সম্পূর্ণ অবৈধ কারণ এটা পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলের দখলদারিত্বের বৈধতা দিচ্ছে।

এক বিবৃতির মাধ্যমে জর্ডান সরকারের মুখপাত্র জানান, এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্বের মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য আর অগ্নিশিখার জন্ম দিয়েছে। যেটা দুই ধর্মের মানুষের জন্য ভয়ানক রুপ ধারণ করবে।

ইসরাইলের পূর্ব জেরুসালেমের দখলদারিত্ব নিয়ে নেয় ১৯৬৭ সালে সিরিয়া, মিশর এবং জর্ডানের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তির দিকে।

যে দখলদারিত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় নি ইসরাইল। যার কারণে তাদের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেম কোনভাবেই যৌক্তিক নয় বলে মনে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ বিন আব্দলরহমান আল থানি বলেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা একটি 'মৃত্যুদণ্ড' ঘোষণা। বিশেষ করে তাদরে জন্য যারা এই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনবরত সংগ্রাম করে।

ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যতের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুসালেমকে মনে করে অপরদিকে ইসরাইল পুরো জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি চায় যেটা তাদের ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহিংসতা আর দখলদারিত্বের বহিপ্রকাশ।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এক টুইটার বার্তায় বলেন, প্যারিস কখনো এই ঘোষণা অনুমোদন বা অনুসমর্থন জানাবে না। কারণ এটি দুই রাষ্ট্র ভিক্তিতে ইসরাইল-ফিলিস্তিনের সংঘাত অবসানে ভয়ানক হুমকি।

এদিকে পাকিস্তান এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এটা ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ট্রাম্পের এই মরণঘাতী ঘোষণার পর সারা বিশ্বের মুসলমানদের আহবান জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোগান বলেন, জেরুসালেমের ইতিহাস রক্ষার সময় এসে গেছে। তিনি এই বিষয়ে সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে এক হওয়ার আহবান জানান।

লন্ডনের লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটা প্রাতিষ্ঠানিক হুমকি। এই বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অপরদিকে তুর্কিশ লেবার ইউনিয়ন থেকে বলা হয়, এটা একটা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত। তাই এই বিষয়ে সবাইকে গণপ্রতিবাদ করার আহবান জানান।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বহির্বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তকে 'একটি ঐতিহাসিক দিন' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, জেরুসালেম এখন থেকে নয় প্রায় ৭০ বছর ধরে ইসরাইলের রাজধানী হয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে ঘোষণা এবং সব দূতাবাস সেখানে স্থাপনের মাধ্যমে মূলত ইহুদিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

এ বিষয়ে এমিনেস্টি ইন্টারন্যাশানালের মধ্যপ্রাচ্যের মুখপাত্র রাইদ জারার বলেন, যেহেতু কোনভাবেই ইসরাইলের জেরুসালেম দখলদারিত্বের আন্তর্জাতিক সম্মতি নেই সুতারাং ট্রাম্পের এই ঘোষণা ভয়ানক সমস্যার জন্ম দিবে। এটা শুধু আন্তর্জাতিক আইনেরই লঙ্ঘন হবে না বরং ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে।
জেড