শ্রীলঙ্কায় ৩টি গির্জা ও ৩টি হোটেলসহ মোট ৮টি জায়গায় ভয়াবহ হামলার পর একদিকে যেমন নিহতদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে হাহাকার বাড়ছে অন্যদিকে সম্প্রদায়িক হামলার ভয়ে আছে সেখানকার মুসলমানরা। এরই মধ্যে শত শত মুসলমান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কায় বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর নিগোম্বোতে সাম্প্রদায়িক হামলার সম্ভাবনা বেশি দেখা দিচ্ছে। কারণ এই শহরে অবস্থিত সেন্ট সাবিস্টিয়ান গির্জায় জঙ্গি হামলায় সবচেয়ে বেশি লোক নিহত হয়েছে। এখানকার গির্জার প্রধানের মতে, শুধু সাবিস্টিয়ানে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০০ এর কাছাকাছি চলে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত ভয়াবহ এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩৫৯।
হামলার পর গতকাল বুধবার প্রায় শতাধিক পাকিস্তানি মুসলিম স্থানীয় বন্দর দিয়ে পালিয়ে গেছে। অনেকে স্থানীয় কমিউনিটির নেতাদের সহযোগিতায় বাস বা অন্যান্য যানবাহন করে পালিয়ে গেছে। পালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তারা জানায়, ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর তারা ক্রমশ প্রতিশোধের হুমকি পাচ্ছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা পালিয়ে যেতে
বাধ্য হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাকিস্তানি মুসলিম আদনান আলী জানান, শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার পর এখানকার স্থানীয়রা আমার বাড়িতে হামলা চালায়। তাই বাধ্য হয়ে এখন পালিয়ে যেতে হচ্ছে। কোথায় যাবেন জিজ্ঞাসা করলে আদনান জানায়, এখনো পর্যন্ত জানিনা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিবো।
রাজধানী কলম্বোর উত্তরা-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই নিগোম্বো শহরে শত শত পাকিস্তানি মুসলিমদের বসবাস। তারা 'আহমাদি' সম্প্রদায়র অনুসারি। কিন্তু যারা শ্রীলঙ্কাতে হামলা চালায় অর্থ্যাৎ আইএস তারা কিন্তু সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠি বলে পরিচিত। এই 'আহমাদি' সম্প্রদায়কে পাকিস্তানে অমুসলিম ঘোষণার অনেক আগেই তারা শ্রীলঙ্কার এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে।
পাকিস্তান থেকে সর্বহারা হয়ে শ্রীলঙ্কায় এসে এই হামলার পর আবার তারা সর্বহারা হতে চলেছে।
ফারাহ জামিল (একজন পাকিস্তানে 'আহমাদি' মুসলিম) জানান, শ্রীলঙ্কায় তার বাড়ির মালিক তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। বলেছে যেখানে খুশি সেখানে যেতে কিন্তু এই এলাকায় যেনো কোনো দিন না আসি।
জামিল আরও জানায়, তারা সবাই আহমাদিয় মসজিদে জড়ো হয়েছে এবং নিরাপদে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করছে।
এই হামলার পরে সেন্ট সাবিস্টিয়ান গির্জার আশেপাশে ২০১৪ সালে মুসলিম বিরোধী রায়টের মতো অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে গির্জার আশেপাশে অনেক প্রতিবেশিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
স্থানীয়দের পাশাপাশি পুলিশও মুসলিমদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের দাবি, স্থানীয়রা যখন সন্দেহভাজন মনে করে তাদেরকে ফোন দেয় তখনই তারা অভিযান চালিয়ে মুসলামানদের গ্রেফতার করে।
'যদি কেউ সন্দেহভাজন হয় তাহলে অবশ্যই আমরা সার্চ করবো' বলে জানান কাটারা পুলিশ স্টেশনের অফিসার জেনারেল (ওসি) সিসিলা কুমারা। যার নেতৃত্বে প্রায় ৩৫ জন মুসলমানকে ধরে আনা হয় যারা মসজিদে জড়ো হয়েছিল স্থানীয়দের হাত থেকে বাঁচার জন্য। পুলিশ তাদেরকে নিরাপদ জায়গা নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে থানায় নিয়ে যায়।
প্রায় ২২ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে শ্রীলঙ্কা গঠিত। এদের মধ্যে অধিকাংশই বৌদ্ধ। তারপরে আছে খ্রিস্টান ও মুসলমান। অধিকাংশ সময়ই বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের ধর্মীয় রোষানলের শিকার হয় অন্যান্য সংখ্যালঘুরা। গৃহযুদ্ধের পরে প্রায়ই ছোটখাটো ধর্মীয় সংঘর্ষ লেগে থাকতো শ্রীলঙ্কায়। যার সুযোগটা নিয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠি।
এদিকে হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জন নিহত হয়েছে। আহত আছে প্রায় ৫ শতাধিক। এখনো পর্যন্ত সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৬০ জনকে।
হামলার দুই দিন পরে দায় স্বীকার করেছে জামাত আল-তাওহীদ। তারপর দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস। যদিও হামলা চালানো পর দুই দিনের মধ্যে কেউ দায় স্বীকার করে নি।
উল্লেখ্য, গত ৪ এপ্রিল হামলার বিষয়ে শ্রীলঙ্কাকে সতর্ক করে ভারত। আবার হামলার দুই ঘন্টা আগেও সতর্ক করে ভারত। কিন্তু তারপরেও সরকার এই হামলা ঠেকাতে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়। সূত্র: রয়টার্স
জেড





